রবিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২১, ০৫:১২ পূর্বাহ্ন

ছোট ভিডিওর ফাঁদে শিশু-কিশোররা

ঢাকা অফিস / ৫৫ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২০, ৯:৫১ অপরাহ্ন

করোনাকালে স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়েকে নিয়ে চিন্তিত গৃহবধূ শিখা রানী। তাঁর বড় মেয়ে দীপা (১৪) অষ্টম শ্রেণি আর ছোট মেয়ে তৃষা (৬) পড়ে প্রথম শ্রেণিতে। স্কুল বন্ধ থাকায় দিন-রাত বাসায়ই থাকে তারা। মোবাইল ফোনে ‘টিকটক করে’, গেম খেলে সময় কাটছে ওদের। এতেও দুশ্চিন্তা মায়ের। রাজধানীর ভাটারার সাঈদনগরের বাসিন্দা শিখা বলেন, ‘লাইকিতে অ্যাকাউন্ট করে নাচ-গান করছিল তৃষা। কিন্তু ওই সব জায়গায় কী সব যে করছে বাচ্চারা! হঠাৎ হঠাৎ আজেবাজে ভিডিও চলে আসে। এগুলো দেখে আমারও টেনশন হয়। ওরা আসলে কী শিখছে? আমি বাচ্চাদের ভালো নাচ-গান শেখাতে চাই। তাই বাধা দিই না, তবে চিন্তা তো বাড়ছে!’ শিখা রানীর মতোই অনেক অভিভাবকের চিন্তা বাড়িয়েছে টিকটক, লাইকি ও ভিগোর মতো অ্যাপ এবং ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো ওয়েবসাইট। এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছোট ছোট ভিডিও কনটেন্টে অশালীন পোশাক, দৃষ্টিকটু ফ্যাশন, আপত্তিকর, মানহানিকর ও মারমুখী আচরণ সামনে আসছে, যা শিশু-কিশোরদের অনেকের চিন্তাজগেক প্রভাবিত করে খারাপ দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অভিভাবকরা। সম্প্রতি টিকটকে গ্যাং গ্রুপ গড়ে ওঠার তথ্যও বেরিয়ে এসেছে। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সোশ্যাল অ্যাপ ও সাইটে ছোট ভিডিও আকারে যেগুলো ছড়িয়ে পড়ছে তা থেকে বেশির ভাগ খারাপ আচরণই শিখছে শিশু-কিশোররা। ভিন্ন দেশের অনুকরণে দেশেও তৈরি হচ্ছে এসব ভিডিও। এখনই এই চর্চা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সামনে আরো বিপর্যয় তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ গবেষক তৌহিদুল হক বলেন, টিকটক ও লাইকির মতো অ্যাপসগুলোতে চালচলন, ফ্যাশন পোশাকে এমন ধরনের কালচার ফুটে উঠছে যেগুলো আমাদের সমাজের নয়। উগ্র আচরণ, মারামারি, অদ্ভুত চুলের কাটিং, ওয়েস্টার্ন কালচারের মতো সম্পর্ক, আপত্তিকর পোশাক, অঙ্গভঙ্গি শিশু-কিশোরদের খারাপ বিষয়গুলোই শেখাচ্ছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন বিনোদন ওয়েবসাইটেও ছোট ভিডিও আকারে এসব চলে আসছে। এর প্রভাবে গ্যাংভিত্তিক কিশোর অপরাধসহ অন্যান্য অপরাধ বাড়তে পারে। তৌহিদুল হক আরো বলেন, ‘১৮ বছরের নিচের শিশুদের উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন পণ্যের ব্যবহার থেকে দূরে রাখার ব্যাপারে বলা হলেও করোনাকালের বাস্তবতায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। শিশুরা এখন অনলাইনে ক্লাস করে। কিছু অভিভাবক সন্তানদের ভালো সময় কাটানোর জন্য অনলাইনে কনটেন্ট দেখতে দিচ্ছেন। কম বয়সের কারণে শিশুরা যে খারাপ দিকগুলো গ্রহণ করছে, তা আমরা খেয়াল করছি না। অশালীন আচরণ, অগ্রহণযোগ্য কনটেন্টও বিনোদন হয়ে উঠছে। তাই সন্তানরা কোন ধরনের কনটেন্ট দেখছে এবং কত সময় অনলাইনে থাকছে তা অভিভাবকদের দেখা উচিত।’ গত ৩ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় মেহেদি হাসান রবিন নামের এক প্রকৌশলীর ওপর হামলা করার অভিযোগে পুলিশ টিকটক-লাইকি ‘সেলিব্রিটি’ ইয়াসিন আরাফাত অপু ওরফে ‘টিকটক অপু’ ওরফে ‘অপু ভাইকে’ গ্রেপ্তার করে। অদ্ভুত কাটিংয়ের রঙিন চুলে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ভিডিও বানিয়ে কয়েক লাখ ফলোয়ার পাওয়া অপুকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। সম্প্রতি জনপ্রিয়তা নিয়ে বিরোধে প্রিন্স মামুন নামের আরেক ‘লাইকি তারকা’র অনুসারীরা অপুর ইনস্টাগ্রাম আইডি রিপোর্ট দিয়ে মুছে ফেলে। ঘটনার জেরে প্রিন্স মামুনকে কিছুদিন আগেই দিয়াবাড়ীতে মারধর করে কিছু তরুণ। অপুর অনুসারীরাই মারধর করেছে বলে অনুমান করে গুলিস্তানের একটি মার্কেটে দুই গ্রুপের মধ্যে ফের মারামারি হয়। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, অনুসারীদের মধ্যে বিরোধ থেকে তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং গ্রুপ। আর অভিভাবকদের অসচেতনতায় শিশু-কিশোররা আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি ও অনুসরণ করছে। এ বিষয়ে পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) নাবিদ কামাল শৈবাল বলেন, ‘অপু নোয়াখালী থেকে বছরখানেক আগে ঢাকায় এসেছে। সেলুনে কাজ করার পাশাপাশি টিকটকের কাজ করছে। তবে আমরা ধারণা করছি, কিশোর গ্যাং হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশে একটি জোর প্রচেষ্টা তারা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা তদন্ত করছি।’ পুলিশ জানায়, মা-বাবার বিচ্ছেদের পর নানার বাড়িতে অনেকটা অনাদরে বেড়ে ওঠে অপু। তার অনুসারীদের মধ্যে নিম্ন আয়ের বখাটে তরুণ থেকে শুরু করে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীও আছে। গত ৬ আগস্ট শিশু-কিশোররা বিপথগামী হচ্ছে উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মনিরুজ্জামান লিংকন সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং তথ্য, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে অশালীন কনটেন্ট সরানোসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেন। অপু, মামুনসহ বাংলাদেশি চারটি আইডি বাতিল করে লাইকি কর্তৃপক্ষ। সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তথ্যমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ হাছান মাহ্মুদ বলেছেন, টিকটক, লাইকি অ্যাপস, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব বা অন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে সমাজে অস্থিরতা ছড়ালে প্রয়োজনে তাদের (কর্তৃপক্ষ) বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ঘুরে দেখা গেছে, টিকটক, লাইকি, ভিগোর মতো ছোট ভিডিওগুলো ফেসবুক ও ইউটিউবে আসছে। ভিডিও দেখতে স্লাইড করলে একই রকমের ভিডিও চলে আসে যেখানে উদ্দেশ্যহীনভাবে লাফালাফি, মারামারি, নাচানাচি ও প্রাংক করতে দেখা যায়। অন্যদের অনুকরণ করে ব্যঙ্গ করার মাধ্যমে মানহানিকর কাজও হচ্ছে এসব ভিডিওতে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ এসব মাধ্যম ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করছে। বেশির ভাগ ভিডিওর কনটেন্ট অশালীনতাপূর্ণ। আবার এসব সস্তা কনটেন্টের অনুসারীদের বেশির ভাগ কম বয়সী। ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আ ফ ম আল কিবরিয়া বলেন, ‘ফেসবুক, ইউটিউবের মতোই টিকটক, লাইকির ছোট ভিডিওর মাধ্যমে অপরাধের কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। প্রাংক ভিডিও তৈরি এবং ট্রল করে হেনস্তা করা হয়। এসব ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং আদালতে ২৯ ধারায় মানহানি মামলা করা যায়। এসব অ্যাপসে আপত্তিকর উপস্থাপন ও অভিযোগের কারণে আমরা নজরদারি বাড়িয়েছি।’ সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির সহকারী অধ্যাপক তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘সোশ্যাল নেটওয়ার্ক মনিটরিং করার যে ধরনের কাঠামো দরকার তা আপ টু দ্য মার্ক নেই। এ অ্যাপগুলো প্রতিদিনই আপডেট হচ্ছে। অথচ আমাদের সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সেটি নেই। ন্যাশনাল গেটওয়ে মনিটরিং সিস্টেম কিছু সাইট নিয়ন্ত্রণ করলেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে অ্যাপগুলোর ব্যবহার চলছে। অবাধ তথ্যপ্রবাহের সময় এগুলো একেবারে বন্ধ করে দেওয়া উচিত হবে না। ফিল্টারিং করে নিষিদ্ধ সাইট ও নিষিদ্ধ কনটেন্ট যেন না যায়, সেগুলো বন্ধ করতে হবে।’ তিনি জানান, উন্নত দেশে শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়। আবার ওপেন মিডিয়ায় ব্যবহারে থাকে কিছু নিয়ন্ত্রণ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

বাংলাদেশে কোরোনা

সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
সর্বমোট
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect. Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.