বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২১, ০৯:১২ পূর্বাহ্ন

বিশেষায়িত হাসপাতাল এড়িয়ে চলছেন রোগীরা!

ঢাকা অফিস / ৬১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২০, ৮:৪৬ অপরাহ্ন

দেশে গত ৮ মার্চ থেকে করোনা প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। দিন যাবার সঙ্গে সঙ্গে কোভিড এবং নন-কোভিড রোগী নিয়ে বিপাকে পরে হাসপাতালগুলো। শুরুতে কোভিড রোগীদের জন্য হাসপাতাল নির্ধারিত করে দেওয়া হলেও সাধারণ রোগীদের নন-কোভিড হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এমনও হয়েছে হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা গেছেন রোগী। ধীরে ধীরে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি সরকারি নির্দেশে অনেক হাসপাতালে একই সঙ্গে কোভিড এবং নন-কোভিড রোগী ভর্তি শুরু হয়। তাতে করে অন্য রোগে আক্রান্ত রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হতে শুরু করেছে। হাসপাতালগুলো পুনরায় রোগী পেতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। তবে কিছু কিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল তথা ইনস্টিটিউটকে কোভিড ডেডিকেটেড করাতে সে হাসপাতালের রোগীরা ভোগান্তিতে পড়েছে। সেসব হাসপাতালে তারা চিকিৎসা নিতে পারছে না বলেও জানা গেছে। করোনার শুরুতে যে ভোগান্তি শুরু হয়েছিল তার সঙ্গে করোনা পরীক্ষার সার্টিফিকেট যোগ হওয়াতে এই ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে। আর যার কারণে একেবারেই গুরুতর অসুস্থ না হলে রোগীরা হাসপাতালমুখী হচ্ছেন না। এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের ২৩ আগস্টের তথ্যমতে সারাদেশে এখন কোভিড রোগীদের জন্য হাসপাতালে শয্যা রয়েছে ১৫ হাজার ২৫৫টি, আর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) রয়েছে ৫৪৫টি। সারাদেশে কোভিড রোগী ভর্তি রয়েছেন চার হাজার ২৪৮ জন, শয্যা খালি রয়েছে ১১ হাজার সাতটি। আর আইসিইউতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ৩৩৫ জন, শয্যা খালি রয়েছে ২১০টি। কোভিড হাসপাতালের শয্যা খালি থাকায় বেশ কিছু কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, এজন্য হাসপাতালের তালিকা করা হচ্ছে। প্রথমে রাজধানী ঢাকা, পরে পুরো দেশে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। যদিও এই নিয়ে বিশেষজ্ঞরা পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন। রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে টাঙ্গাইল থেকে আসতেন ৫৩ বছরের আব্দুল হাকিম মৃধা। করোনা শুরুর পর যখন এই হাসপাতালকে সম্পূর্ণভাবে কোভিড রোগীদের জন্য ঘোষণা করা হয় তখন থেকে আব্দুল হাকিমের চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে। মোবাইল ফোনে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সাধ্যের ভেতরে থাকা বেসরকারি কয়েকটি হাসপাতালে গিয়েছিলাম, কিন্তু কোনও ডাক্তার দেখাতে পারিনি। তারা রোগী দেখছেন না। একটা পরীক্ষা করানো দরকার গত তিন মাস ধরে। কিন্তু সেখানে গিয়ে যে পরীক্ষা করাবো সে ভরসা পাচ্ছি না।’ এই হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বাংলাট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ নেই কারণ কোভিড রোগীরা এখানে ভর্তি। আবার অন্য হাসপাতালে গেলে তাকে প্রথমে করোনা পরীক্ষা করাতে হবে। সে পরীক্ষাতে ভোগান্তি, রিপোর্ট পেতে ভোগান্তি-আবার করোনা পরীক্ষা ছাড়া রোগী ভর্তি নেবে না, সবকিছু মিলিয়ে খুবই বিশৃঙ্খল অবস্থা।’ এই চিকিৎসক বলেন, ‘কুর্মিটোলাতে আগে বহির্বিভাগে প্রতিদিন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী দেখতাম ৭০ থেকে ৮০ জন আর ইনডোরে রোগী ভর্তি থাকতেন ২৫ থেকে ৩০ জন, এখন একজনও নেই। এর অর্থ হচ্ছে, বিশেষায়িত যেসব হাসপাতালগুলোকে কোভিড ডেডিকেটেড করা হয়েছে, সে হাসপাতালের রোগীরা চিকিৎসা নিতে ভোগান্তিতে পড়েছে বেশি। একইসঙ্গে এই হাসপাতালে কিডনি জটিলতাতে ভোগা যেসব রোগীদের ডায়ালাইসিস হতো তারাওতো আসতে পারছেন না এখানে। এসব সার্ভিস যে বন্ধ হয়ে গেল তাতে করে রোগীরা ভুগছে।’ রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে করোনা ডেডিকেটেড করার পর এই হাসপাতালের রোগীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন। গত ১৬ আগস্ট গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আগের সেই ভিড় নেই প্রধান ফটকে। এখানে ভর্তি হওয়া কয়েকজন করোনা আক্রান্ত রোগীর স্বজনরা অপেক্ষা করছেন সেখানে। হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক চট্টগ্রাম থেকে আসা এক রোগীর উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘তার চিকিৎসা কেবল এই ইনস্টিটিউটেই করা সম্ভব ছিল। ৫১ বছরের এই রোগী চট্টগ্রাম থেকে এসেও এখানে ভর্তি হতে পারেননি। সারাদিন হাসপাতালের সামনের রাস্তায় বসে ছিলেন। তাকে হাসপাতালের ভেতরে কোথাও বসাতেও পারিনি। যদি তিনি হাসপাতালে ঢুকে সংক্রমিত হয়ে যান সেই ভয়ে।’ গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারি হিসাবে প্রতিদিন দেখছি কোভিড হাসপাতালের শয্যা শূণ্য রয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে বিশেষায়িত এসব হাসপাতাল থেকে কোভিড তুলে দেওয়া দরকার। নয়তো আমাদের রোগীরা মারা যাবেন চিকিৎসা না পেয়ে।’ তবে কোভিড এবং নন-কোভিড চিকিৎসা দেওয়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনার প্রাদুর্ভাবের পর থেকে আশঙ্কাজনক হারে রোগী কমে গেলেও সে চিত্র বদলে গেছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘এখনও এই হাসপাতালে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে। তবে সাধারণ রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি বেড়েছে। এতদিন নন-কোভিড ইউনিটে ইনডোরে ৫০০ এর মতো রোগী হলেও আজ (২৩ আগস্ট) ভর্তি হয়েছে এক হাজারের মতো। আবার বহির্বিভাগে এতদিন ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী থাকলেও এখন সেটা হয়েছে দেড় হাজার।’ সাধারণ রোগীর স্রোত বেড়ে গেছে মন্তব্য করে ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, ‘আগে যে অবস্থা ছিল সেটা এখন আর নাই। এতদিন শয্যা ফাঁকা ছিল, এখন শয্যাপূর্ণ হচ্ছে ধীরে ধীরে।’ একই কথা বলেন রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী রশিদ উন নবী। রোগী সংখ্যা অনেক বেড়েছে এবং ভর্তি রোগী প্রায় ৮০০ এর মতো থাকছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বহির্বিভাগ এবং জরুরি বিভাগ মিলিয়ে রোগী আসছে ২ হাজার এর বেশি, প্রায় আড়াই হাজারের কাছাকাছি। করোনার শুরুতে রোগী সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছিল, কিন্তু এখন আর রোগীরা যাবেন কোথায়। রোগের চিকিৎসাতো করাতে হবে, আর কতদিন ঘরে বসে থাকবেন। তখন ভয় ছিল, এখন সে ভয় অনেকটা কেটেছে। তাই হাসপাতালে রোগীরা আবার আগের মতো আসতে শুরু করেছে। এতে করে ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসকরা খুশি।’ স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, ‘যেহেতু সবকিছু এখনও স্বাভাবিক হয়নি, সেহেতু অনেক কিছুই অস্বাভাবিক-এটাই হবে। সবকিছু স্বাভাবিক না হলে স্বাভাবিক আশা করাও যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘মুগদা হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মতো হাসপাতালগুলোকে স্বাভাবিক পর্যায়ে যেতে একটু সময় লাগবে। একইসঙ্গে রোগীরা নিজেরাও হাসপাতালে যাচ্ছে না সেখানে সংক্রমিত হবার ভয় রয়েছে। রাস্তাতে এখন অনেক মানুষ। কিন্তু মার্চের আগে যে মানুষ বের হতো, সে পরিমাণ লোকতো এখনও বের হয়নি। তাই সবকিছু এখনও স্বাভাবিক হয়নি, তার প্রভাবতো নিশ্চয়ই হাসপাতালগুলোতেও রয়েছে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

বাংলাদেশে কোরোনা

সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
সর্বমোট
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect. Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.