মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন

সব চেকপোস্টে সিসিটিভি

অনলাইন ডেস্ক / ২৮ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২০, ২:৪৮ পূর্বাহ্ন

‘ভাই পেছনেই সিসিটিভি ক্যামেরা। এই চেকপোস্টে কী ঘটছে, তা সিসিটিভিতে ধরা পড়ছে। ক্যামেরা থাকার কারণে আমরা অনেক বেশি সতর্ক থাকি। আর যাদের চেক করা হয় তারা অনেক সময় অহেতুক অভিযোগ করেন। সিসিটিভি থাকলে কেউ খামোখা অভিযোগ করে পার পাবেন না। সিসিটিভি দেখলেই আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে। ২৪ ঘণ্টা নজরদারির জন্য দেশের সব চেকপোস্টে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা দরকার।’ বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর গুলশান-১ নম্বরে শুটিং ক্লাবের সামনে বসানো চেকপোস্টে দায়িত্বরত সহকারী পুলিশ পরিদর্শক আলিমুজ্জামানের অভিমত এটি। তিনি আরও বললেন, ‘দেখেন না কক্সবাজারের চেকপোস্টে কী ঘটে গেল। সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলে এত তদন্তেরও দরকার পড়ত না। সিসিটিভি ক্যামেরার চোখই বলে দিত আসলে কী ঘটেছিল সেই রাতে।’ সরেজমিন গুলশানের এই চেকপোস্টে দেখা যায়- অভিজাত এলাকায় মধ্যরাতে অনেক গাড়ির আনাগোনা। তবে খুব বেশি গাড়ি চেকপোস্টে আটকানো হচ্ছে না।
সংশ্নিষ্টদের বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাক্ষী-প্রমাণের চেয়ে তথ্যপ্রযুক্তিগত ক্লু যে কোনো তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি অনেক ঘটনায় তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশেও অনেক বড় বড় ঘটনার আসল কাহিনি জানা গেছে সিসিটিভির ফুটেজের তথ্য ধরেই। গত ৩১ জুলাই টেকনাফের এপিবিএনের চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে সাবেক মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানের মৃত্যুর ঘটনার পর আবারও আলোচনায় উঠেছে এসেছে সিসিটিভির গুরুত্ব। অনেকেই বলছেন- ওই চেকপোস্টে সিসিটিভি বা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের কাছে বডি ওর্ন ক্যামেরা থাকলে অনেক প্রশ্নের জট সহজেই খুলে যেত। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সারাদেশের সব চেকপোস্ট সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার জন্য একটি প্রকল্প স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের ঘটনার পর পুলিশ চাইছে দ্রুত সব চেকপোস্টে ক্যামেরা বসুক। এতে অনেক সময় পুলিশের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগের আঙুল তুললেও আসলে কী ঘটেছে, তা সিসিটিভি বা বডি ওর্ন ক্যামেরাই বলে দেবে।
পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজারের চেকপোস্টে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার নিহত হওয়ার ঘটনার পর চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে আরও বেশি সতর্ক তারা। করোনার কারণে অনেক দিন ধরেই সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকলে কারও গাড়ি থামিয়ে ব্যাগ বা শরীর তল্লাশি করা হচ্ছিল না। এখন কক্সবাজারের ঘটনার পর চেকপোস্টে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তারা আরও বেশি ‘সংবেদনশীল’। একাধিক জেলার পুলিশ সুপার সমকালকে জানান, বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট থাকলেও খুব বেশি প্রয়োজন না হলে তল্লাশি করা হচ্ছে না।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অনেক ঘটনার পরই দুই ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কক্সবাজারের ঘটনাটির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। পুলিশ মামলায় বলেছে- ঘটনার সময় চালকের আসনে বসা সেনাবাহিনীর মেজর পরিচয়দানকারী ব্যক্তি হঠাৎ কোমরের ডান পাশ থেকে পিস্তল বের করে গুলি করার জন্য উদ্যত হলে লিয়াকত (পরিদর্শক) তাকে চার রাউন্ড গুলিবর্ষণ করেন। তবে মামলার তদন্ত সংস্থা সূত্র বলছে, প্রত্যক্ষদর্শীরা তাদের জানিয়েছেন- ঘটনার সময় সিনহার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না।
অপরাধ বিশ্নেষকরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে সিসিটিভি বা বডি ওর্ন ক্যামেরা থাকলে মূল রহস্য বের করা সহজ হয়। আসল দৃশ্যপট জানা সহজতর হয়।
এ ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, শিগগিরই ঢাকার ১০০ ক্রসিং পয়েন্টে ৬০০ সিসিটিভি ক্যামেরা বসছে। এর জন্য দরপত্রও হয়ে গেছে। চেকপোস্টে আসলে কী ঘটছে তা সঠিকভাবে জানতে সিসিটিভির আওতাধীন ও দায়িত্বরত সদস্যদের বডি ওর্ন ক্যামেরা কাজে আসে। আমরা বডি ওর্ন ক্যামেরাও সরবরাহ করেছি। কিন্তু অনেক ঘটনার পর দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা বডি ওর্ন ক্যামেরা চালু রাখেননি। এতে আসল ঘটনা বের করা যায়নি।
মোহা. শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, চেকপোস্ট দুই ধরনের থাকে। একটি হলো স্থায়ী। কূটনৈতিক এলাকায় এ ধরনের স্থায়ী চেকপোস্ট রয়েছে। আবার অনেক সময় অপরাধী ধরতে কৌশলগত অবস্থান থেকে হঠাৎ কোনো জায়গায় চেকপোস্ট বসাতে হয়। স্থায়ী চেকপোস্টে সিসিটিভি ক্যামেরার বসানো যায়। হঠাৎ চেকপোস্ট বসাতে হলে সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা নেওয়া যায় না। ওই জায়গায় দায়িত্বরত সদস্যদের বডি ওর্ন ক্যামেরা থাকতে হবে। আমরা এটা নিশ্চিত করব যে, দিনে-রাতে যখনই চেকপোস্ট বসানো হয়, সেখানে যাতে পুলিশ সদস্যরা বডি ওর্ন ক্যামেরা সঙ্গে রাখেন; এমনকি তা চালু রাখতে হবে।
কয়েক বছর ধরে রাজধানীতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের বডি ওর্ন ক্যামেরা দেওয়া হয়। এ ক্যামেরা দেওয়ার পর গাড়ির চালক থেকে শুরু করে পথচারীরা রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে সাবধানে কথা বলছেন। আবার ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও পথচারীদের সঙ্গে কথোপকথনে সতর্কতা বজায় রাখেন। তবে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ জায়গায় বডি ওর্ন ক্যামেরা চালু রাখছেন না পুলিশ সদস্যরা।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ যেসব উদ্যোগ নিয়ে থাকে, তার মধ্যে একটি চেকপোস্ট। উন্নত বিশ্বে প্রায় সব চেকপোস্ট সিসিটিভির আওতাধীন। সেখানে দায়িত্ব পালনকারীদের কাছে ক্যামেরা থাকে। অপরাধ দমনে তা যথেষ্ট কাজে আসে। বাংলাদেশেও একাধিক সময় চেকপোস্টে অনেক দাগী আসামি ও জঙ্গি ধরা পড়েছে। প্রায় ৬ বছর আগে রাজধানীর গাবতলীতে একটি চেকপোস্টে সন্দেহভাজন তিনজনকে তল্লাশির সময় মাসুদ রানা নামে এক দুর্ধর্ষ জঙ্গি ধরা পড়ে। ওই চেকপোস্টে ছুরিকাঘাত করে পুলিশের এক সদস্যকে হত্যার পর মাসুদের দুই সহযোগী পালিয়ে যায়। পরে জানা যায়, নব্য জেএমবির যে অংশটি হলি আর্টিসানে হামলা করেছিল; তাদের সহযোগী ছিল মাসুদ রানা। এভাবে অনেক সময় পুলিশের চেকপোস্টকে টার্গেট করে অপরাধী ও জঙ্গিদের হামলা চালাতে দেখা গেছে। গত এক বছরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে একাধিক চেকপোস্ট ও ট্রাফিক বক্সের আশপাশে ছোটখাটো বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সিসিটিভিসহ অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তির গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, সিসিটিভি ফুটেজের কারণেই বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যারহস্য এত দ্রুত উদ্ঘাটন করা গেছে। বরগুনায় সিফাত হত্যার ঘটনার অনেক ক্লু সিসিটিভি থেকে বের হয়েছে। পুরান ঢাকায় বিশ্বজিৎ হত্যার ঘটনায়ও অনেক রহস্যের জট খুলে দেয় সিসিটিভি। সর্বশেষ পর্বতারোহী রেশমা নাহার রত্নার সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনায় ৩৮২টি সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্নেষণ করে ঘাতক মাইক্রোবাস চালক নাঈমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, চেকপোস্ট সিসিটিভি ও বডি ওর্ন ক্যামেরার আওতায় এলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন। অনেক সময় এমন অভিযোগ পাওয়া যায়- চেকপোস্টে তল্লাশির নামে নিরীহ মানুষের পকেটে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক দিয়ে ফাঁসিয়েছে পুলিশ। আবার তল্লাশির নামে কারও কাছ থেকে টাকা, স্বর্ণালঙ্কারসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। চেকপোস্টে স্বর্ণালঙ্কারসহ দামি কিছু পাওয়া গেলে উদ্ধার তালিকায় তা ঠিকঠাক দেখানো হয় না- এমন অভিযোগও আছে। চেকপোস্টে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এ ধরনের অনিয়ম রুখতে সহায়তা করবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, চেকপোস্টে সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশ সদস্যরা কেমন আচরণ করেন, এটা জানতে প্রতিদিন সিভিল ড্রেসে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরেজমিন মনিটর করার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা পালিত হয় না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান গতকাল সমকালকে বলেন, সিসিটিভি বিলাসী কোনো পণ্য নয়। মডার্ন সিকিউরিটি সিস্টেমের অংশ। আরও আগেই পুলিশের সব চেকপোস্ট সিসিটিভির আওতায় আনা দরকার ছিল। শুধু চেকপোস্ট নয়; পুলিশের আর কী ধরনের স্পর্শকাতর স্থাপনা রয়েছে যেখানে সিসিটিভি লাগবে, সেটাও খুঁজে বের করা দরকার। তবে শুধু সিসিটিভি লাগালেই হবে না; এর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কিনা, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কেননা, অতীতের কিছু অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

বাংলাদেশে কোরোনা

সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
২,৯৪৯
৩৭
২,৮৬২
১৩,৪৮৮
সর্বমোট
১৭৮,৪৪৩
২,২৭৫
৮৬,৪০৬
৯০৪,৫৮৪
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect. Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.