শনিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২১, ০২:৩২ অপরাহ্ন

বিপজ্জনক কৌশল

ঢাকা অফিস / ৭৯ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২০, ৯:৩২ অপরাহ্ন

এক কিটে দুই পরীক্ষা, ভুল ফলের শঙ্কা

দেশে কিট সংকট। তাই বিকল্প পথ। এক কিটে দুই করোনার নমুনা পরীক্ষা। খরচ বাঁচাতে বিকল্প পদ্ধতিতে সরকার অনুমোদিত কিছু পরীক্ষাগার এই কাজ করছে। এতে বড় বিপর্যয় হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিছু পরীক্ষাগার আরটি-পিসিআর মেশিনে দু’টি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিট ব্যবহার করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কাজটি কেবল অবৈজ্ঞানিক এবং অনৈতিকই নয়, এর ফলে ভুল ফলাফল আসার ঝুঁকিও রয়েছে। এভাবে পরীক্ষার কারণে এই উচ্চ সংক্রামক ভাইরাসটি আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তারা বলছেন, মানুষের জীবন-মরণের যেখানে বিষয় সেখানে এভাবে পরীক্ষা চলতে পারে না। এটি এখনই পরিহার করতে হবে। সূত্র বলছে, ৪০টির উপরে ল্যাবে এভাবে পরীক্ষা হচ্ছে। এসব ল্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, কিটের তীব্র সংকটের কারণে তারা এক কিট দিয়ে দুই নমুনা পরীক্ষা করছেন। কয়েকটি ল্যাব কর্মকর্তার দাবি, এই পদ্ধতিতে কাজ করার জন্য তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মৌখিক পূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন। একটি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিট ব্যবহার করা বিশ্বব্যাপী স্ট্যান্ডার্ড অনুশীলন হলেও তারা এক কিটে দুই নমুনা পরীক্ষা করেও একই মানের ফলাফল পাচ্ছেন। অথচ কোভিড-১৯ পরীক্ষায় জাতীয় নির্দেশিকাতেও বলা হয়েছে, একটি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিট ব্যবহার করতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি আরটি-পিসিআর কিটে রিএজেন্ট থাকে। যা এই পরীক্ষা বা অনুরূপ রাসায়নিক পরীক্ষার প্রধান উপাদান। এতে থাকা রিএজেন্ট একটি নমুনা পরীক্ষার জন্য দেয়া থাকে। কয়েকটি ল্যাবের কর্মকর্তা জানান, তারা প্রতিটি নমুনা পরীক্ষার জন্য কিটে অর্ধেক রিএজেন্ট ব্যবহার করছেন। এতে খরচ বাঁচছে। কোভিড-১৯ জাতীয় নির্দেশিকায় পরীক্ষার জন্য কিটে কতটা রিএজেন্ট থাকবে তার পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেয়নি। ল্যাবে যা করা হচ্ছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এ বিষয়ে জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য, দেশের বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, এ পদ্ধতি তারা ব্যবহার করতে পারেন না। তাদেরকে সঠিকভাবে একটি কিট দিয়েই একটি পরীক্ষা করতে হবে। ভুল ফলাফল আসলে জাতির ক্ষতি হবে। সংক্রমণ আরো ছড়িয়ে পড়বে। বিপর্যয় বয়ে আনবে। তারা জরিপ করার জন্য একটি কিটে দু’টি পরীক্ষা করতে পারেন। কিন্তু মূল পরীক্ষা একটি কিটে একটি করতে হবে। জনগণ টাকা দিয়ে পরীক্ষা করাচ্ছেন। তিনি বলেন, ল্যাবের পলিসি থাকতে পারে। সরকারের গাফিলতির কারণে কিট সংকট। ৫ লাখ কিট আনার পরামর্শ দিয়েছে পরামর্শক কমিটি। ঠিকাদারদের টাকা পরিশোধ না করায় তারা কিট এনেও সরবরাহ করছে না বলে এই বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ ল্যাবরেটরি বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে মানবজমিনকে এ বিষয়ে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) ছাড়াই এ জাতীয় কাজ করা অবৈজ্ঞানিক ও অনৈতিক। রোগীর জীবন-মরণের বিষয়। এটা করার সুযোগ নেই। একটি কিট দিয়ে একটি পরীক্ষা করাতে হবে। গাইডলাইন ছাড়া এটা করা যাবে না। পরিহার করা উচিত। তিনি বলেন, এর কারণে ভুল ফলাফল আসতে পারে এবং এটা গ্রহণযোগ্য না। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজিস্ট ও সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান এ ব্যাপারে গণমাধ্যমকে বলেন, একটি পরীক্ষার জন্য একটি কিট তৈরি করা হয়। রিএজেন্ট কম ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। এমন করা হলে পরীক্ষার ফল প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) ল্যাবরেটরি ইনচার্জ অধ্যাপক ডা. শাকিল আহমেদ জানান, কিটের অভাবে কম কিট দিয়ে বেশি পরীক্ষা করার জন্য তাদের এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করতে হয়েছে। এখন তারা প্রতিদিন প্রায় ৩০০ পরীক্ষা এভাবে করছেন। তিনি বলেন. এটা ট্রায়াল করে ভাল ফলাফল পেয়েছি। ২০টি কিট দিয়ে ৪০টার কাছাকাছি পরীক্ষা করাতে পারছি। তিনি জানান, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রথম এই পদ্ধতির ব্যবহার শুরু করে। অধ্যাপক শাকিল বলেন, তারা প্রথমে একটি গবেষণা করে ইতিবাচক ফল পেয়েছেন। আমরা সেই পদ্ধতি অনুসরণ করেছি এবং আমাদের গবেষণায়ও একই রকম ফল পেয়েছি। তিনি বলেন, কিটের ঘাটতি রয়েছে। তাই আমাকে কম পরীক্ষা করতে হবে কিংবা রিএজেন্টের পরিমাণ কম ব্যবহার করে বেশি পরীক্ষা করতে হবে। আমি দ্বিতীয় বিকল্পটি বেছে নিয়েছি। এজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কোনো নির্দেশনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো নির্দেশনা নেই। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও একই পদ্ধতি অনুসরণ করছে বলে সূত্র বলছে। কোভিড-১৯ পরীক্ষায় নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যার হাসপাতালেও স্বাভাবিকের চেয়ে কম রিএজেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। কম রিএজেন্ট ব্যবহার করে ভালো ফলাফল পাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক গৌতম রায়। তিনি বলেন, আমরা ভালো ফল পাচ্ছি। কোনো সমস্যায় পড়ছি না। একটি কিট দিয়ে দুইটি নমুনা পরীক্ষা করা যাচ্ছে। এজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কোনো নির্দেশনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো নির্দেশনা নেই। হাসপাতালটিতে এখন গড়ে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৩৫টি পরীক্ষা হচ্ছে। ফি নির্ধারণের আগে নমুনা পরীক্ষা হতো ২৮০’র উপরে। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটিতেও (সিভিএএসইউ) কোভিড-১৯ পরীক্ষায় দু’টি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিট ব্যবহার করছে। রিএজেন্ট হিসেবে কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। এখানে প্রতিদিন প্রায় ২০০ নমুনা পরীক্ষা করা হয়। সিভিএএসইউ’র ল্যাব ইনচার্জ অধ্যাপক জোনায়েদ সিদ্দিকী এ বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, আমরা আমাদের অন্যান্য সহকর্মীদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি যে একটি কিটের অর্ধেক রিএজেন্ট ব্যবহার করেও একই ফল পাওয়া যায়। এতে খরচ কম হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লিখিত কোনো নির্দেশনা আছে কি না জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, লিখিত নির্দেশনা নেই। তবে মৌখিকভাবে বলেছে, খরচ যেহেতু বাঁচে তাই চাইলে করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়টির এ ল্যাবে ৬ হাজার কিটের চাহিদার বিপরীতে বৃহস্পতিবার ৪ হাজার কিট সরবরাহ করা হয় বলেও জানান তিনি। সিভিএএসইউ’র আরেক অধ্যাপক মেজবা উদ্দিন আহমেদও বললেন, এটি ত্রুটি কোনো পদ্ধতি নয়। এতে বৈজ্ঞানিক কোনো অসুবিধা নেই। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার মানবজমিনকে বলেন, কয়েকটি ল্যাব দু’টি নমুনা পরীক্ষার জন্য একটি কিট ব্যবহার করে ভালো ফলাফল পাচ্ছে। বিষয়টি আমরা জানি। তবে, আমরা এটি করার জন্য কোনো নির্দেশনা দেইনি। তিনি আরো জানান, ল্যাব বিশেষজ্ঞরা একটি কিট দিয়ে ভালো ফলাফল পাচ্ছেন, তারা এটা করছেন। নিজ থেকেই তারা করছেন। বাকি পরীক্ষাগারগুলো নিয়মিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। প্রসঙ্গত, বর্তমানে সারা দেশে ৮০টি প্রতিষ্ঠান কোভিড-১৯ পরীক্ষা করছে। এই ৮০টি ল্যাবে গড়ে দৈনিক পরীক্ষার সক্ষমতা ১৩ হাজার থেকে ১৯ হাজার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখে দুই হাজার ৪১২ জনের কোভিড-১৯ পরীক্ষা করা হচ্ছে। যা ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় অনেক কম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

বাংলাদেশে কোরোনা

সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
সর্বমোট
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect. Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.