মঙ্গলবার, ০৯ মার্চ ২০২১, ০৬:৪৬ পূর্বাহ্ন

রিজেন্ট প্রতারণার দায় এড়াতে নকল চিঠি বানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক

Reporter Name / ৮৪ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২০, ২:৪৩ অপরাহ্ন

করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতারণা বাণিজ্যের ঘটনায় নিজেদের দায় এড়াতে পেছনের তারিখ দিয়ে কিছু আজগুবি নকল চিঠি বানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। 
যদিও র‌্যাবের অভিযানের আগে এসব চিঠির কোনো অস্তিত্বই ছিলো না। এমনকি এসব চিঠির স্মারক নম্বরের কোনো রেকর্ড নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদফতরের নথিপত্র সংরক্ষণ শাখায়। 

রিজেন্ট কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট সবাই রয়েছে তদন্তের আওতায়। দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে শুরু করে প্রশাসনের সব সংস্থা রিজেন্ট হাসপাতাল কাণ্ডে জড়িতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই বেরিয়ে এসেছে, বিভিন্ন অনিয়ম সত্ত্বেও রিজেন্ট হাসপাতালকে ‘সুবিধা’ দিতে ভূমিকা রাখা স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসান নিজেকে বাঁচাতে নকল চিঠি বানিয়েছেন!

জানা যায়, ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানের পর এপ্রিল ও জুন মাসের তারিখ উল্লেখ করে একাধিক চিঠি ইস্যু করা হয় স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে। ডা. আমিনুল হাসানের সই করা এই চিঠিগুলোর একটিতে লাইসেন্স নবায়ন বিষয়ে রিজেন্ট হাসপাতালকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান বরাবর লেখা আরেক চিঠিতে কোভিড রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। তবে দুইটি চিঠির কোনোটিরই স্মারক নম্বর স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র সংরক্ষণ শাখায় অন্তর্ভুক্ত নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নিজেকে ‘বাঁচানোর জন্য’ আমিনুল হাসান পরে কোনো একসময় চিঠিগুলো বানিয়ে নিয়েছেন।

১ এপ্রিল ডা. আমিনুল হাসানের সই করা চিঠিতে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যানের উদ্দেশে লেখা হয়, আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপনার প্রতিষ্ঠানকে রেজিস্টার্ড হাসপাতাল হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায়। আপনার প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশনটি দীর্ঘদিন ধরে নবায়ন না হওয়ায় জরুরিভিত্তিতে নবায়ন করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো। বিষয়টি অতি জরুরি বলেও উল্লেখ করা হয় চিঠিতে।

এই চিঠির স্মারক নম্বর ‘স্বাঃঅধিঃ/হাসঃ/রিজেন্ট হাসপাতাল লিঃ/MOU/২০২০/৫৬৬৯’। এই চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে। চিঠিতে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের সমন্বয় বিভাগের সহকারী পরিচালককে।

অন্যদিকে, ১৭ জুন ডা. আমিনুলের সই করা আরেক চিঠিতে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যানের উদ্দেশে লেখা হয়, আপনার হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় ভর্তি রোগীদের কাছ থেকে অযাচিতভাবে বিছানা ভাড়া ও অন্যান্য সেবার জন্য প্রচুর অর্থ গ্রহণ করছে, যা কোভিড হাসপাতাল হিসেবে চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়। এ অবস্থায় আদায় করা অর্থ ফেরত দেওয়াসহ চুক্তির শর্ত মেনে চলতে অনুরোধ করা হলো। তা না হলে রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে উল্লেখ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

‘অতি জরুরি’ এই চিঠির স্মারক নম্বর ‘স্বাঃঅধিঃ/হাসঃ/রিজেন্ট হাসপাতাল লিঃ/MOU/২০২০/৫৮৩৬/১’। এই চিঠির অনুলিপিও দেওয়া হয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে। চিঠিতে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের সমন্বয় বিভাগের সহকারী পরিচালককে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, যেকোনো সরকারি চিঠি আদান-প্রদানের সময় সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের নথিপত্র সংরক্ষণ বিভাগে পাঠানো হয়। সেখানে নির্ধারিত বইয়ে চিঠির স্মারক নম্বর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর, সুনির্দিষ্টভাবে পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুলের সই করা এই দুই চিঠির স্মারক নম্বরের কোনো রেকর্ড নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদফতরের নথিপত্র সংরক্ষণ শাখায়।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সমন্বয় বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে গণমাধ্যমকে জানান, তিনি অধিদফতরের হাসপাতাল বিভাগ থেকে এমন কোনো মেইল বা চিঠি পাননি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে জানা যায়, এসব চিঠি যায়নি মহাপরিচালকের কার্যালয়েও। একই তথ্য জানায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র।

এর আগে, গত ১ এপ্রিল ও ২ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে যেসব চিঠি ইস্যু করা হয়, সেগুলোর স্মারক নম্বর ছিল পর্যায়ক্রমে ৪৪৯, ৪৫১, ৪৫৩ ও ৪৫৪। কিন্তু  নতুন এই চিঠিতে স্মারক নম্বরে দেখা যায় ৫৬৬৯, জুন মাসের চিঠিতে স্মারক নম্বর ছিল ৫৮৩৬/১।

এপ্রিল ও জুনের এই দুই চিঠির স্মারক নম্বরে কেন এই অসামঞ্জস্যতা, চিঠি দুইটির কোনো রেকর্ড অধিদফতর বা মন্ত্রণালয়ে নেই কেন— জানতে চাইলে গণমাধ্যমকে ডা. আমিনুল বলেন, এটা আমি বলতে পারব না। প্রতিদিন এমন হাজার হাজার চিঠি ও ফাইল আমাকে দেখতে হয়। তাই আমার পক্ষে কোনো কিছু এক্সাক্টলি মেমোরাইজ করা ডিফিকাল্ট। এটা সম্ভব না। যেমন গতকালও আমি কয়টা ফাইল দেখছি, চিঠি দিয়েছি, কী করছি— এটাও কিন্তু আমি আজকে বলতে পারব না।

এর আগে, রিজেন্ট হাসপাতালের অনিয়ম-প্রতারণা নিয়ে গত ৫ জুলাই ডা. আমিনুল বলেছিলেন, রিজেন্টের লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকার বিষয়টি তাদের জানানো হলেও তারা গুরুত্ব দেয়নি। একই দিন রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া বিল নেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের কাছে যতবার অভিযোগ এসেছে, ততবারই আমরা প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে ফোন করে জানিয়েছি। তারপরও কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে দেখিনি।

দুই ক্ষেত্রেই রিজেন্টকে বিষয়গুলো মৌখিকভাবে জানানোর কথা বললেও কোনো চিঠি দেওয়ার বিষয় উল্লেখই করেননি ডা. আমিনুল।  এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল বিভাগের এমন সব অসামঞ্জস্যতার বিষয়ে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি ও কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ডা. এম ইকবাল আরসালান গণমাধ্যমকে বলেন, দেশে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি মিসগাইড করেছে হাসপাতাল পরিচালক। তার ব্যর্থতার দায় সবাইকে বহন করতে হচ্ছে। এখন এভাবে পুরনো তারিখ দিয়ে চিঠি ইস্যু করা হয়, তাহলে সেটা পরীক্ষা করলেই ধরা পড়বে। তদন্ত করলেই সব অনিয়ম বের হয়ে আসবে। এসব অনিয়মকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

বাংলাদেশে কোরোনা

সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
সর্বমোট
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect. Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.