রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৬:০৯ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
সংবাদ শিরোনাম :
দৈনিক হাওয়া ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১ ইং। খুলনায় বিএনপির সমাবেশে বক্তারা : আন্দোলনের মাধ্যমেই সরকার উৎখাত করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে কুমারখালীতে আবর্জনার স্তুপে গৃহবধুর লাশ উদ্ধার ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার সনজিভ ভাটির কুঠিবাড়ি ও বাঘা যতিনের ভিটা পরিদর্শ পরীক্ষা নেওয়ার দাবীতে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা রাজধানীর মানিকদীতে যুবলীগ নেতা গুলিবিদ্ধ কুমারখালীতে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত জনির উদ্দিনের পাশে দাঁড়ালো তরুণ সমাজসেবক মুশতাকের মৃত্যু নাগরিক সমাজে শীতল বার্তা দিচ্ছে, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি কুষ্টিয়ায় করোনাকালীন সংকটেও রমরমা কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ শিক্ষকের বিরুদ্ধে মেহেরপুরে মোটরসাইকেল ও রোলার এর মুখোমুখি সংঘর্ষে ২ শ্রমিক আহত

চীন-ইরান এলায়েন্স,পালাবদলের শুরু

গৌতম দাস / ৯৬ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০, ১০:৪৩ অপরাহ্ন

বিশ্বে পরাশক্তিগত ব্যবস্থা যাকে আমরা অনেকে ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বলে বুঝে থাকি, এর আসন্ন পালাবদলে নির্ধারক এক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। চীন ও ইরান এক দীর্ঘমেয়াদি এবং ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক উন্নতিকে ফোকাস করে এক স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ চুক্তি করতে যাচ্ছে। এটা হবে দীর্ঘস্থায়ী,স্ট্র্যাটেজিক সাথে বাণিজ্যিকভাবেও গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া। অবস্থা এমন হয়ে যাবে যাতে ইরানের গায়ে কেউ ফুলের টোকা দিলেও সেটা চীনের গায়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, চীনের স্বার্থে লাগবেÑ এমন অবস্থা হয়ে যাবে। স্বার্থের প্রশ্নে তারা বহুদূর কমন স্বার্থ হয়ে হাঁটবে। তাতে এ নিয়ে তাদের মধ্যে আলাদা করে কোনো ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত থাকুক আর নাই থাকুক। চুক্তির খসড়া দলিল তৈরি শেষ। তবে অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীনÑ যা দু’দেশের পার্লামেন্টে আলোচনা ও পাস হওয়া এরপর রাষ্ট্রপ্রধানসহ যেসব অফিসের অনুমোদনের ধাপ আছে তা সমাপ্ত করার প্রক্রিয়া অচিরেই শুরু হবে; কিন্তু এরই ফাঁকে আমেরিকার দিক থেকে দেখলে এক সফল গোয়েন্দাগিরি সম্পন্ন হয়েছে। আর চীন-ইরানের দিক থেকে দেখলে কোনো বিশ্বাসঘাতক, হলুদ কাগজের ১৮ পৃষ্ঠার খসড়া দলিলটা চুরি করেছে আর পরে নিউ ইয়র্ক টাইমস সেটি হাতে পেয়ে ছেপে দিয়েছে। পত্রিকার দিক থেকে দেখলে হাতে পেলে তো তারা ছাপবেই। যদিও চুরি করে পাওয়া দলিল ছাপানোতে একটা গোপন রহস্য ধরনের ভাব তৈরি হয়েছে যেনবা চীন-ইরান কোনো অপরাধ করছিল যা টাইমস প্রকাশ করে দিয়েছে। না, কোনোভাবেই এটা তেমন কিছুই নয়। কোনো ধরনের অপরাধ তো নয়ই। ট্রাম্পের আমেরিকার ইরানের ওপর যেসব সীমাহীন অবরোধ চাপানো আছে যাতে ইরান একেবারেই কোণঠাসা, অর্থনীতি ধুঁকছে, এই করোনাকালে ইরানিদের জীবন থমকে গেছে যেখানে। তবে ট্রাম্পের এসব অবরোধ আরোপের উদ্দেশ্য আর এতে কৃত আসল অপরাধ হলো ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের হয়ে শত্রুতামূলক কাজ করা। এই অবরোধ জাতিসঙ্ঘের নয়, কেবল আমেরিকার আরোপিত বলে তা মানতে কোনো দেশের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। বরং আমেরিকার অবরোধ আরোপ মানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের অপব্যবহার আছে। কারণ আমেরিকান অবরোধ আরোপ কথার বাস্তব মানে হলো, ইরানকে নিষেধ করে দেয়া যে তুমি আমেরিকান ডলারে কেনাবেচা করতে পারবে না। অতএব এ অবস্থায় গায়ের জোরের মুরোদে কুলালে সবার আগে এই আমেরিকান অবরোধ উপড়ে ফেলে দেয়াটাই হবে খুবই জায়েজ কাজ। তবে ইরান-চীনের হবু চুক্তির দলিল সংরক্ষণ ব্যবস্থা শক্ত থাকা উচিত ছিল। চুক্তিটা ঠিক কী নিয়ে সামগ্রিকভাবে উপর থেকে দেখলে, এটা চীন থেকে পুঁজি আর টেকনোলজি ধার নিয়ে ইরান নিজের অবকাঠামো, শিল্প আর সাথে সামরিক ব্যবস্থাদিও গড়ে নেয়া। টাইমেসের ভাষায়, ব্যাংকিং, টেলিকম, বন্দর, রেলওয়েসহ আরো ডজনখানেক প্রকল্প, এ ছাড়া সামরিক সহযোগিতা, গবেষণা, ট্রেনিংসহ। এভাবে নিজেকে সবল বাণিজ্যিক পার্টনার হিসাবে গড়ে তোলা। আর ওই ধার শোধ দিতে চীনকে ইরানের তেল-গ্যাস সরবরাহ করা। মোট ২৫ বছরে এনার্জি দিয়ে বিনিময়ে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও টেক পাওয়ার চুক্তি এটা। টাইমসের ভাষায়, এ জন্য এটা এক ‘বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার’ প্যাক্ট। যদিও অর্থের পরিমাণটা অবশ্যই বেশ বেশি এবং ধারাবাহিকভাবে ২৫ বছরে ৪০০ বিলিয়ন। একটা তুলনা দিয়ে বলা যাক এটা কত বড় অঙ্কের অর্থ। বিশ্বব্যাংক প্রতি বছর সবখাতক রাষ্ট্রের জন্য অবকাঠামো খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার মোট বাজেট হলো বছরে ৫০-৬০ বিলিয়ন। সেখানে ইরানের এই ঋণ হলো গড়ে একাই নিজ-রাষ্ট্রের জন্য প্রতি বছরে ১৬ বিলিয়ন করে, কিন্তু ধারাবাহিক ২৫ বছর। ইরানের কাছে এই ঋণের গুরুত্ব কী কম করে বললে সেই ১৯৫৩ সাল থেকে ইরান ধুঁকে মরছে, লড়ছেও। আমেরিকা যখন ফিজিক্যালি সিআইএ অ্যাজেন্ট পাঠিয়ে ইরানের নির্বাচিত সরকার ফেলে দিয়ে শাহকে ক্ষমতায় বসিয়ে চার দেশ মিলে ইরানের তেল লুট করে নেয়ার চুক্তিটা করে নিয়েছিল সেই থেকে। এর চেয়ে প্রকাশ্যে সম্পদ লুণ্ঠন আর কী হতে পারে! এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালের খোমেনির বিপ্লব সফল করে লুটেরাদের হাত থেকে নিজের সার্বভৌমত্ব সামলে ছিল কিন্তু সেটাকে সংহত সুরক্ষিত করতে গিয়ে ইরানিদের অর্থনৈতিক জীবনটা আর কখনো স্থায়িত্ব দেয়া, একটু থিতু হওয়া আর কখনই সম্ভব করতে পারে নাই। প্রধান সঙ্কট প্রয়োজনীয় পুঁজি-বিনিয়োগে ঘাটতি ও টেকনোলজি পাওয়া আর ওদিকে নিজের অ্যানার্জি পণ্য অবরোধের কারণে বিক্রি করতে না-পারা, সবসময় এগুলোই তাদের বেঁধে রেখেছে। এই যে চার দিকে নেই নেই অথচ দেশের প্রয়োজনীয় সম্পদ আছে গরিব দেশ নয়Ñ এ অবস্থা থেকে ইরান সম্ভবত এবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে। এই প্রথম ইরানের বিনিয়োগে খরা কাটতে যাচ্ছে। শিক্ষিত বা সক্ষম মানুষেরা কাজ পায় না, সে দুঃখ ঘুচবে এবার। উপচে ওঠা প্রভাব ইরানের হবু এই চুক্তি নিঃসন্দেহে ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু সাধারণভাবে দেখলে এটা আর পাঁচটা দেশের বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের মতোই কিছু ঘটনা। কিন্তু ততটুকুতেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে? অবশ্যই না। কারণ, এতে কিছু প্রভাব অন্য প্রভাবের ওপর পড়বে আর তাতে প্রভাবগুলোর মোট যোগফল বা কিউমিউলেটিভ পরিণতি হবে গভীর। আর এটাই গ্লোবাল অর্ডারে বড় ধরনের পালাবদল ঘটিয়ে ফেলবে। সব গ্লোবাল উত্তেজনা এখানেই। খুব সম্ভবত আগামী ইতিহাসে, কোন কোন ঘটনা থেকে পালাবদলে গ্লোবাল অর্ডারের নেতৃত্ব পুরানা পরিস্থিতি ছাড়িয়ে চীনের হাতে চলে এসেছিল- এর অন্যতম হিসেবে চীন-ইরানের এই হবু চুক্তির কথা লেখা হবে। এই চুক্তি এমনই বড় প্রভাবশালী হয়ে উঠতে যাচ্ছে এবং হওয়ার মতোই পটেনশিয়াল। যেমন একটা পটেনশিয়ালিটি বা সম্ভাব্য আড়ালে থাকা ক্ষমতার কথা বলি। এক কথায় বললে, আমেরিকার ইচ্ছামতো যাকে খুশি যেকোনো দেশের ওপর অবরোধ আরোপ করে তাকে ডলারে কেনাবেচার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। এর টেকনিক্যাল সুযোগ সে পরে পেয়েছে। ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সময় এর সদস্যরা একমত হওয়াতে একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই আন্তর্জাতিক বিনিময় মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কারণ মুদ্রার বাস্তব অসুবিধা হলো, কোনো না কোনো রাষ্ট্রীয় মুদ্রাকেই একই সাথে তাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতে হয়। কোনো রাষ্ট্রীয় মুদ্রার বড় ইতিগুণ হলো এটাই একমাত্র বাস্তব ও ব্যবহারিক মুদ্রা। ফলে যা লোকাল একটা দেশের মুদ্রা যে মুদ্রার নিয়ন্ত্রণ ওই দেশের তাকেই উপায়হীন হয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়। এটাই মুদ্রার গুণ-বৈশিষ্ট্যের ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা। মুদ্রার এই সীমাবদ্ধতা কাটানোর কোনো সমাধান এখনো দুনিয়াতে নেই। তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে যদিও ডলারে কেনাবেচা করতে ইরানকে কেউ বাধা দিতে পারে না। কারণ ইরানও আইএমএফের সক্রিয় সদস্য। কিন্তু আমেরিকা এর বিপরীতে বলবে সে নিজের রাষ্ট্রীয় মুদ্রা হিসেবে যে ডলার সেই ডলারে বেচাকেনা করতে ইরানকে বাধা দিতেই পারে। এই এক্তিয়ার তার আছে। সোজা কথা, মুদ্রার গুণগত সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা বাড়তি এই ক্ষমতাটা অপব্যবহার করছে। আমেরিকার এই অপব্যবহার এতই মারাত্মক যে গত ২০০৮ সাল থেকে বারো বছর ধরে রাশিয়াকে সে আজও ডলার-অবরোধ দিয়ে রেখেছে। পরিণতিতে রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের মূল্য অর্ধেক হয়ে আছে। শেষে প্রায় ইরানের মতনই রাশিয়াও চীনের সাথে এক এনার্জি চুক্তি করে অর্থনীতি সামলিয়েছে। আর ওদিকে ব্রিটেন রাশিয়ান গ্যাস ব্যবহার করে আর সেই গ্যাসের মূল্য থেকে পাওয়া আয় রাশিয়া আবার ব্রিটিশ বাজারে বিনিয়োগ করে রেখেছে বলে ব্রিটেনের বিশেষ অনুরোধে আমেরিকা কেবল এই অর্থটা ছাড় দিয়ে রেখেছে। তাই মূলত চীনের সাথে লেনদেনের জোরে রাশিয়া বাজারে টিকে আছে। এটাই আবার চীন-রাশিয়ার বিশেষ এলায়েন্সের আসল ভিত্তি। যদিও কেউ কেউ এখনো ভুল করে ‘কমিউনিস্ট ইডিওলজি’ এদের সম্পর্কের ভিত্তি মনে করে; যা একেবারেই ভিত্তিহীন। আর ইডিওলজির সম্পর্ক ছিন্ন আজকে নয় সেই ১৯৫৮ সাল থেকেই ভেঙে চুকেবুকে গেছে। বরং আমেরিকার ডলার-অবরোধের ক্ষমতা ভাঙতে চীনের মিত্র সবচেয়ে আগ্রহী শক্তি রাশিয়ার পুতিন। অতিরিক্ত ছটফটে পুতিন পারলে এখনই কিছু করে এ জন্য যেকোনো কিছু করতে রাজি। তবে এ নিয়ে চীনের সাথে রাশিয়ার যৌথ পরিকল্পনা আছে। ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া মানে কী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাপারটা কী তা কমিউনিস্টদের আজো ঠিকমতো বোঝা হয়নি। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাটা ১৯৪৪ সালে আইএমএফÑ বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের চালু হলেও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো এতে অংশ না নেয়ায় (আমেরিকাও নেতিবাচক মনোভাব রাখাতে যেমন, সুনির্দিষ্ট করে পোল্যান্ডের সদস্যের আবেদন না করে দিয়েছিল আমেরিকা) কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক ছাড়াই বিকশিত হয়েছে। এভাবে ১৯৯২ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার আগে পর্যন্ত। এরপরে এরা সবাই সদস্যপদ নেয়। তত দিনে দুনিয়ার বাণিজ্যে কেনাবেচা প্রধাণত ডলারেই সম্পন্ন হওয়া শুরু হয়ে গেছে। প্রধান মানে? সত্তর ভাগের বেশি লেনদেন যদি কোনো একক মুদ্রায় সম্পন্ন হয় তাহলে সেটিই প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রা ধরতে পারি। এটা অনেকটা খুব চালু দোকানের খাবারের মতো। খুব চালু বলেই ওর খাবার সবসময় টাটকা ও ভেরাইটি থাকে। ফলে ওর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পারা যায় না। কিন্তু একবার যদি তার বিক্রি পড়ে যায় তবে দোকান শেষ। একইভাবে, ডলারের ক্ষেত্রে, ওর প্রতিদ্বন্দ্বী মুদ্রা গ্লোবাল লেনদেনের মুদ্রা হিসাবে একবার সত্তর ভাগের কাছাকাছি চলে গেলে ডলারের দফারফা হয়ে যাবে। এটাই ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া। এ দিকে চীনা ইউয়ান শর্ত পূরণ করাতে গত ২০১৫ সাল থেকে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে আইএমএফের স্বীকৃতি পায়। আর সেই থেকে রাশিয়ার সাথে চীন পরিকল্পনা করে করে আগাচ্ছে। এখনকার মুল পরিকল্পনাটা হলো, চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক। বড় অর্থনীতি বলে চীনকে প্রচুর জ্বালানি কিনতে হয়। মানেই তার এক বড় পেমেন্ট হলো জ্বালানির মূল্য শোধ করা। অতএব হিসাবটা হলো, এই পেমেন্ট যদি সে ডলারে না করে নিজ মুদ্রা ইউয়ানে করে তাহলে ওই ৭০% গ্লোবাল লেনদেন থেকে ডলারকে হটানোর পথে অনেক দূর আগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এত দিন এই পরিকল্পনা ছিল মধ্যপ্রাচ্য সৌদি-গালফকেন্দ্রিক, বাদশাহরা যদি আমেরিকার বিরুদ্ধে রাজি হয় ভরসা করে; ইরানকে নিয়ে ভাবা হয়নি। কারণ ইরান আজকের হবু সম্পর্কের মধ্যে আসতে চায় এমন আগ্রহ আগে দেখায়নি। আর চীনের প্রস্তাব ছিল সামগ্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী, এখনকার হবু চুক্তির মতো হতে হবে এই শর্তের। ইরানের আগে অনাগ্রহটা কেন ছিল তা বুঝতে অপর বিরোধী নেতা আহমদিনেজাদের প্রতিক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। তিনি বলছেন, এই চুক্তি হলে আমরা অনেক বেশি চীনা নির্ভরশীল হয়ে যাবো। বাইরে থেকে দেখলে তিনি সম্ভবত আগামী নির্বাচনে লড়ার কথা ভাবছেন। প্রশ্নাতীতভাবেই ইরান চীনা নির্ভরশীল তো হবেই। কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হলো ইরানের হাতে এর বিকল্প কী আছে? ব্যাপারটা হলো পোলাও পাতে আসার অপশন যদি নাই থাকে তবে পোলাও খাবো কি না সেই বাছাবাছির অর্থ কী! যদিও ইলেকশনি ইস্যু হিসেবে দেখলে আহমদিনেজাদের বক্তব্যের গুরুত্ব আছে। সেটি যাই হোক, এবারের সর্বশেষ ২০১৯ সালের মে মাসের শুরু থেকেই ট্রাম্পের যে কড়া অবরোধ এতে এক চীন আর ভেনিজুয়েলা ছাড়া কোথাও ইরানি তেল বেচা যায়নি। ভারত প্রথম কোনো তেল কিনেনি। তা-ও সেটি আবার কনসেশন রেটে আর নিজ নৌবাহিনী পাহারায় নিজ ট্যাংকার-ক্যারিয়ারে করে তা পাঠাতে এবার ইরানি-অফার ছিল তা সত্ত্বেও। ফলে ইরানের পাবলিক তাদের জীবনযাত্রায় আর কত গভীর চাপ, আর কত দিন সহ্য করতে পারা সম্ভব- এটাও মুখ্য বিবেচনার দিক হয়ে উঠেছে এখানে। সম্ভবত সে কারণে এর আগে সহসা ইরান রাজি হতে পারেনি। এবার বাধ্যবাধকতা বেশি অনুভব করে রাজি হয়েছে। এতে গালফ বাদশাহদের ইউয়ানের চীনা তেলের পেমেন্ট নেয়াতে রাজি করানো যতটা কঠিন ছিল এখানে সে কাজ অনেক সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, দেখা যাচ্ছে। কারণ খসড়া চুক্তিতে দেখা যাচ্ছে সব লেনদেন হবে চীনা ইউয়ানে, লেখা আছে। সুতরাং এটা একটা বিরাট অগ্রগতি। অর্থাৎ পালাবদলের ধাক্কা দেয়ার ক্ষেত্রে এক বিরাট পদক্ষেপ হয়েছে এটা। অর্থাৎ এই চুক্তির ইমপ্যাক্ট কেবল ইরানের কী লাভ-সুবিধা হলো ততটুকুতেই নয় বরং এক গ্লোবাল ক্ষমতায় প্রভাব প্রতিপত্তিতেও বড় ভূমিকা রাখবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত ভারতে চিন্তাবিদরা এখন বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন যে, তাদের চিন্তার ক্ষমতা-সামর্থ্য কত সীমিত! এই চিন্তাবিদ বলতে নানান রঙের কথিত থিংকট্যাংক বা একাডেমিক বা কনসাল্টিং ফার্মের কথা বলছি। এক কথায় বললে, এই চুক্তি ভারতকে ভারতের স্বার্থ একেবারে ধসিয়ে দেবেÑ যেটার আগাম কোনো হদিস এই চিন্তাবিদরা ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের দিয়েছে প্রমাণ জানা যায় না। এই চুক্তির কারণে ভারত মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা বাণিজ্য সহায় সমর্থনহীন অবস্থায় পড়বে। এ ছাড়া এই হবু চুক্তির আয়োজনের ফলে ভারতকে চীন এমন দুর্দশা পরিস্থিতিতে ফেলে দেবে যে, ভারতকে এখন খোলাখুলি চীন অথবা আমেরিকা কোনো একটা পক্ষ বেছে নিতে হবে। অর্থাৎ সেই সময় এসে গেছে যখন ‘এ-ও হয় ও-ও হয়’ বলে দু’দিকেই নৌকায় পা দিয়ে থাকার সুবিধা এনজয় করার দিন শেষ। এতে ভারতের আমেরিকা ক্যাম্পে গেলে হয়তো সামরিক দিকে কিছু সুবিধা হতে পারে। কিন্তু বাইরের অর্থনৈতিক সাহায্য সমর্থন পাওয়ার দিন শেষ হবে। আর যদি চীনের ক্যাম্পে মাথা নিচু করে ফেরে তবে চীনের টার্মে ফিরতে হবে। কম দরে বিক্রি হতে হবে। যে কথাটা বলছিলাম ভারতীয় চিন্তার সামর্থ্য- এখন এটা ভারতের রাজনীতিক ও চিন্তাবিদদের জন্য প্রমাণ করা খুবই কঠিন যে, চীন-ইরান যে এমন একটা দীর্ঘস্থায়ী এলায়েন্স করে বসতে পারে তা তারা বিন্দুমাত্র আগে জানত। অর্থাৎ ইরানি তেল না কিনলে মুখ ঘুরিয়ে নিলে যে ভারতের বহুমুখী স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হবেÑ সেটি তারা আগে দেখতেই পায়নি। তাদের চোখে মেরা ভারত মহান হয়েই ছিল বা অনেক ক্ষমতাবান হয়েই ছিল। তার মানে দাঁড়াল ভারতে শুধু উদ্বৃত্ত বা বিনিয়োগের বিপুল ঘাটতি আছে তাই নয়, চিন্তার সামর্থ্যরে দিক থেকেও পেছনে আছে। আমেরিকান থিংকট্যাংকের পাল্লায় পড়ে তাদের স্ব-ক্ষমতাটাও শেষ। সর্বশেষ যেদিন ১৩ মে ২০১৯ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ এক দিনের সফরে এসেছিলেন এবং খুবই মনোক্ষুণœ হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। কারণ এর আগেই ২ মে ২০১৯ থেকে ইরানের অনুরোধ ফেলে মাড়িয়ে ভারত ইরানি তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই অন্তত শেষবারের মতো শেষ কথা শুনতে এসেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ। এমনকি পরিষ্কার করে বলেছিলেন, এই আমেরিকান থিংকট্যাংক- সিএসআইএস-তোমাদের ডুবিয়ে ছাড়বে, এদের পাল্লায় পড়ো না। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি। এমনকি পরের ২ অক্টোবর ২০১৯ এ আমেরিকায় মিডিয়াকে জয়শঙ্কর দাবি করে বুঝাচ্ছিলেন তেল কেনা বন্ধ করে দেয়ায় ইরান ভারতের ব্যাপারে হতাশ হয়নি। আরো সাফাই দিয়ে বলেছিলেন, ‘যার যার দেশের বাধ্যবাধকতা আছে আর (আরেক দিকের) সুবিধাও আছে।’ এর মানে তাহলে এখন চীন-ইরান নতুন চুক্তির পথে চলে যাওয়ায় নিশ্চয় ভারতের কোনো ক্ষতি বা অসুবিধা হয়নি, তাই নয় কি? তাহলে চার দিকে মিডিয়ায় ভারতের নাকিকান্না কেন? যদিও বেশির ভাগ মিডিয়া ভারতের ক্ষতিটা কী হয়েছে সেটিও বোঝেনি। যেমন দ্য হিন্দু। এটাকে অনেক বুদ্ধিমান অগ্রসর মিডিয়া বলে মানুষ মানে। কিন্তু ওর শিরোনাম দেখুনÑ ‘ইরানে চাবাহার রেল প্রজেক্ট থেকে ভারতকে বের করে দিয়েছে ফান্ড দিতে ভারতের দেরি দেখে।’ কিন্তু ঘটনাটা কী এতই সহজ আর এতটুকুই! অথচ ওই রিপোর্টেই ভেতরে ওই চীন-ইরান চুক্তির সবকিছুর উল্লেখ আছে। এর সোজা মানে হলো, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদকে হতাশায় ফিরিয়ে দেয়াকে তারা দেখেছিল আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক এত বিশাল কিছু আর এতে ভারতের জন্য অর্জন এতই বড় যে, ভারতের এর বিপরীতে ক্ষুদ্র ইরানের কথাগুলো নিয়ে ভাবা অপ্রয়োজনীয়, খুবই স্মল। কাজেই সব চীনের দোষ। যেমন দেখুন আরো কিছু মিডিয়ায় শিরোনাম : ‘চাবাহার প্রকল্পে ধাক্কা ভারতের, নেপথ্যে চিন’, ‘ইরানের একটি বড় প্রকল্প থেকে ভারতকে বাদ’, ‘চীন-ইরান দোস্তি, যুক্তরাষ্ট্রে অস্বস্তি’। অর্থাৎ এই চুক্তির বড় পিকচার বা গ্লোবাল প্রভাবের দিকটা কেউ আমল করতে পারেনি। নেহাতই একটা ইরানি প্রকল্প থেকে ‘চীনের প্রভাবে’ ভারতকে বের করে দেয়া হিসেবেই বুঝেছে। এভাবে চীনকে দোষারোপ করে নিজেদের চিন্তা করারও অযোগ্যতা তারা ঢাকতে চাচ্ছে। আবার ভারত আমেরিকান সখ্যকে অতিগুরুত্ব দিয়ে তারা বলতে চাচ্ছে ভারত ইরানি তেল কেনা বন্ধ করতে পারবে কিন্তু ইরান ভারতকে রেল প্রজেক্ট থেকে বাদ দিতে পারে না। এর চেয়ে বরং কংগ্রেসে কিছু বুদ্ধিমান লোক আছে মনে হয়। তারা বলেছে,‘চীন বেটার ডিল দিয়ে ইরানকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে আর সরকার সেটি আগে বুঝতে পারেনি।’ কংগ্রেস অন্তত চীনকে দোষী করেনি। প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখেছে। যার চিন্তার সামর্থ্য যে মাপের আলটিমেটলি সে সেই খাপেই এসে আটকা পড়ে!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

বাংলাদেশে কোরোনা

সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
সর্বমোট
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect. Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.