শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৪৯ অপরাহ্ন

ভারী বর্ষণে বন্যার অবনতি

ঢাকা অফিস / ৮৭ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০, ১০:৪০ অপরাহ্ন

দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির কোনো আভাস নেই। ভারী বর্ষণে বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে লাখ লাখ বন্যাদুর্গত মানুষ। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক দিন টানা বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে দুর্ভোগ আরো বাড়বে। ফরিদপুরে পদ্মার পানি বেড়েই চলেছে। গতকাল রোববার সকালে বিকট শব্দে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে কয়েক মিনিটেই তলিয়ে গেছে শহরসংলগ্ন আলিয়াবাদ ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক বাড়ি। বন্যার পানিতে জেলার বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে যাতায়াত। ফরিদপুর ছাড়াও রাজবাড়ী, মাদারীপুর, বগুড়া, কুড়িগ্রাম ও শেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কিছুটা উন্নতি হয়েছে সিরাজগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে। এ ছাড়া ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে আবারো বাড়ছে পানি। রাজবাড়ীতে পদ্মার পানি বাড়ায় সদর, গোয়ালন্দ, পাংশা ও কালুখালী উপজেলার দুই হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। মানিকগঞ্জে পদ্মা ও যমুনার পানি বাড়ায় চরাঞ্চলের ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও গোখাদ্যের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ভেঙে গেছে। তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। কুড়িগ্রামে ভারী বৃষ্টিতে আবারো বাড়ছে ধরলা নদীর পানি। জেলার চর ও নিম্নাঞ্চলের প্রায় ২ লাখ বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য মিলছে না প্রয়োজনীয় খাদ্যসহায়তা। এ দিকে তিস্তার ভাঙন আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকাতে চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফরিদপুরের শহরসংলগ্ন আলিয়াবাদ ইউনিয়নে বায়তুল আমান-সাদিপুর সংযোগ সড়ক কাম বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় ৫০ মিটার অংশ ধসে গেছে। গতকাল রোববার সকাল পৌনে ৭টার দিকে পানির তীব্র স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে ওই বাঁধের বিস্তীর্ণ অংশ ধসে যায়। এতে একটি বাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। চোখের সামনে বসতবাড়ি এভাবে পানিতে ভেসে যেতে দেখে অসুস্থ হয়ে পড়া ওই বাড়ির মালিককে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আকস্মিক ওই বন্যার পানি প্রবেশ করায় নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে গেছে। এসব পরিবারের লোকজন সড়কের উপরে গবাদিপশু ও আসবাবপত্র নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদেরকে নারী, শিশু ও গবাদিপশু নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ফরিদপুরের গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মার পানি গতকাল রোববার সকালে ১ সেন্টিমিটার কমে ৯.৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, যা বিপদসীমার ১০৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। রোববার পর্যন্ত জেলার প্রায় ২৮ হাজারেরও বেশি পরিবার বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। জেলা সদরের ডিক্রিরচর, নর্থচ্যানেল, আলিয়াবাদ ও চর মাধবদিয়া ইউনিয়ন ছাড়াও, চরভদ্রাসন উপজেলা, সদরপুর উপজেলা ও ভাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। জেলার পদ্মার অববাহিতায় বিস্তীর্ণ ফসলের জমি ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে সাপের উপদ্রব দেখা গেছে। সেখানে মানুষ ও গোখাদ্যের সঙ্কট চলছে। ফরিদপুর চরভদ্রাসন আঞ্চলিক সড়কে সড়কের বেশ কয়েকটি স্থানে পদ্মার পানিতে তলিয়ে রয়েছে। জেলার মধুমতির নদীর আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে পানি বৃদ্ধির সাথে ভাঙন শুরু হয়েছে। ফরিদপুরে আলিয়াবাদ ইউনিয়নে বাঁধ ভেঙে মুহূর্তের মধ্যে এলাকার ৫৭টি বাড়ি নিমজ্জিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দা দুলাল শেখ (৫১) বলেন, বাঁধটি ভেঙে পড়ার সময় একটি বিকট শব্দ হয়। বাঁধের উত্তর দিক ও দক্ষিণ দিকে পানির ব্যবধান ছিল আনুমানিক তিন ফুট। দক্ষিণ দিক শুকনো ছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে বিকট শব্দে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে ৫৭টি ঘর ডুবে যায়। তীব্র স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে সব কিছু ভাসায় নিয়া যায়। খড় কুটার মতো মুরগি, গরু, ছাগল সব ভাইসা যায়। এতে সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট। এলাকাবাসীর অভিযোগ, গত শনিবার সন্ধ্যায় থেকেই বাঁধের এপাশ থেকে ওপাশে পানি চোয়াতে শুরু করে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের জানালেও তারা কোনো তৎপরতা দেখাননি। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর এলাকায় হুলুস্থূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিমজ্জিত বাড়ির লোকজন ফ্রিজ, টিভি, আলমারিসহ যাবতীয় মূলবানসামগ্রী বেড়ি বাঁধের ওপর নিয়ে জড়ো করতে থাকেন। টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকায় বন্দর নগরীর বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল গতকাল নিমজ্জিত হয়ে যায়। দুপুরের পর বৃষ্টিপাত কিছুটা কমলে আস্তে আস্তে পানি কমতে থাকে। কোথাও হাঁটু পানি, আবার কোথাও কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে নগরীর মূল সড়ক ও অলিগলি। টানা বৃষ্টির কারণে পানি নিমজ্জিত অবস্থায় নাকাল হতে হচ্ছে নগরবাসীকে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস বেলা ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৪৫.১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। একই সাথে সমুদ্র বন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে। নগরীর নিম্নাঞ্চলের বেশির ভাগ বাসার নিচতলায় ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়েছে। নগরের ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র চাক্তাই খাতুনগঞ্জও পানিতে ডুবেছে। বিভিন্ন স্থানে সড়ক-বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় থমকে যায় জনজীবন। পানি নিমজ্জিত অবস্থায় নগরীর বিভিন্ন স্থানে যানজটও চোখে পড়েছে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ করোনার কারণে থমকে আছে ফলে, সামান্য বৃষ্টিতেই পানিতে ডুবছে নগরীর সড়ক, অলিগলি। উজান থেকে প্রবল বেগে নেমে আসা ঢলের কারণে পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শেরপুর সদর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ৩৫টি গ্রামের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ১৫ হাজার পরিবার। কাঁচাঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, রোপা আমন ধানের বীজতলা, সবজি, দুই শতাধিক পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। শেরপুর-জামালপুর সড়কের ওপর দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হওয়ায় শেরপুর-ঢাকা এবং উত্তরবঙ্গের সাথে এ পথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অপর দিকে ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোগাই ও চেল্লাখালী নদীর পানি কমে যাওয়ায় ওই দুই উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। পিরোজপুরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কঁচা, বলেশ্বর, কালীগঙ্গা ও সন্ধ্যা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে ছোট হয়ে যাচ্ছে নদ-নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো। ভাঙ্গনে কয়েক হাজার একর ফসলি জমি, ফলদ ও বনজ বাগান, বসতবাড়ি, হাট-বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ মসজিদ মন্দির নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। হুমকির মুখে পড়েছে বড় মাছুয়া স্টিমার ঘাট, তেলিখালী লঞ্চঘাট, চরখালী ফেরিঘাট, চরখালী লঞ্চ ও স্টিমার ঘাট, বেকুটিয়া ফেরিঘাট, হুলারহাট লঞ্চ ও স্টিমার ঘাট, কাউখালী লঞ্চ ঘাট ও আরড়াঝুরি ফেরিঘাট। ভাঙ্গনের তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করায় ফেরিঘাট, লঞ্চ ও স্টিমার ঘাটের গ্যাংওয়ে ও পন্টুন প্রায়ই কর্তৃপক্ষকে সরাতে হচ্ছে। ইন্দেরহাট ও ছারছিনা দরবার শরিফের কিছু অংশ রাতের আঁধারে সন্ধ্যা নদীতে বিলীন হয়েছে। পদ্মার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় মুন্সীগঞ্জের চারটি উপজেলার নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোর প্রায় ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। গতকাল রোববার সকাল থেকে শ্রীনগরের ভাগ্যকুল পয়েন্টে বিপদসীমার ৬২ সেন্টিমিটার এবং মাওয়া পয়েন্টে ৫৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পদ্মার পানি প্রবাহিত হওয়ায় মুন্সীগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। গত শনিবার নদী ভাঙ্গন ও বন্যা পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে লৌহজং ইউএনও মোহাম্মদ কাবিরুল ইসলাম খাঁন। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মু: রাসেদুজ্জামান, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মকর্তা মো: এমরান হোসেন তালুকদারসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের নিয়ে পরিদর্শনকালে বন্যা ও ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো বাঁধ নির্মাণে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সরকারি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হয়েছে বলে জানান লৌহজং ইউএনও মোহাম্মদ কাবিরুল ইসলাম খাঁন। সরকারি হিসাবে ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী থাকার তথ্য থাকলেও বাস্তবে এই সংখ্যা ১৫ হাজার পরিবার ছাড়িয়ে যাবে। আগামী দুই দিন গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নদ-নদীগুলোর পানি বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া। অন্য দিকে পানি বৃদ্ধির সাথে পদ্মায় তীব্র ঘূর্ণায়মান স্রোতের তোড়ে ভাঙ্গন তা ব চলছেই। ইতোমধ্যে লৌহজংয়ের হলদিয়া গ্রামের জামে মসজিদের একাংশ বিলীন হয়ে গেছে পদ্মায়। সুনামগঞ্জে পরপর দুইবার বন্যায় গতকাল রোববার পর্যন্ত সরকারি হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা এক লাখ আট হাজার ১২৯ হলেও প্রকৃত হিসাব অনেক বেশি বলে ধারণা করছে হাওরের মানুষজন। জেলার সব নদ-নদীর পানি কমলেও হাওরে পানি কমছে ধীরে, দখিনা বাতাস দিলেই প্রবল ঢেউয়ের সাথে পানিও বেড়ে যায়। এ কারণে এখনো অনেক বাড়িঘর, গ্রামীণ রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে রয়েছে। জেলা শহরের আশপাশের মানুষজন আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করলেও হাওর এলাকার আশ্রয় কেন্দ্রে এখনো বহু মানুষ কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার তেলিয়ালামা পাড়া ও আশপাশের গ্রাম এলাকার ৬০টি পরিবারের দুই শতাধিক মানুষ এখনো জামালগঞ্জ সরকারি কলেজে অবস্থান করছে। আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা বুরুজ মিয়া (৬২) বলেন, ১০-১২ দিন ধরে পরিবার নিয়ে তিনি আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন। এখনো পানি নামেনি। তাই ঘরেও যেতে পারছেন না। সরকারিভাবে কিছু শুকনো খাবার ও যৎসামান্য ত্রাণ পেলেও তা কোনো কাজে আসছে না। গতকাল রোববার দুপুরে জামালগঞ্জ সরকারি কলেজে আশ্রয় নেয়া ২০০ পরিবারের মাঝে রান্না করা শুকনো খিচুড়ি বিতরণ করেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ জামালগঞ্জ উপজেলা শাখা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা জমিয়তের সভাপতি মাওলানা আবদুল গফফার, সাধারণ সম্পাদক সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মু: রশীদ আহমদ, সহসভাপতি মাওলানা রুহুল আমীন, কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বীন বারী, প্রভাষক কামরুল ইসলাম, উপজেলা যুব জমিয়তের সভাপতি মাওলানা রায়হান বিন আরিফ, সহসভাপতি হাফেজ তরিকুল ইসলাম, কারি আবু সুফিয়ান নুরী, মাওলানা মুশাহিদ, ছাত্র জমিয়তের সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ আল জাবের ও স্থানীয় সাংবাদিকবৃন্দ। এদিকে দ্বিতীয় দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ পৌর শহরের উত্তর আরফিন নগর এলাকায় ৫১৮টি পরিবারের প্রত্যেককে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে সুনামগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে ওই সব বন্যার্তকে চাল বিতরণ করেন পৌরসভার মেয়র নাদের বখত। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভা ার রক্ষক ও টেগ অফিসার মো: কুতুব উদ্দিন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মো: শোয়েব আহমদ চৌধুরী, প্যানেল মেয়র হোসেন আহমদ রাসেল, পৌর আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক লিটন সরকার, পৌর কাউন্সিলর আবাবিল নুর প্রমুখ। কুড়িগ্রামে অবিরাম বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে আবারো ধরলা ও তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি এখনো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে বুড়িরহাট স্পার হুমকির মুখে পড়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকায় চরাঞ্চল ও নি¤œাঞ্চলের দুই লক্ষাধিক বানভাসি মানুষ মানবেতর জীবন-যাপন করছে। ত্রাণ স্বল্পতার কারণে চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটে পড়েছে এসব বন্যাদুর্গত মানুষ। চারণভূমি তলিয়ে থাকায় তীব্র হয়ে উঠছে গবাদিপশুর খাদ্যের সঙ্কট। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের এস ডি মাহমুদ হাসান জানান, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়া পয়েন্টে ৫০ সেন্টিমিটার ও ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার ৫২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে তিস্তার বুড়িরহাট স্পার হুমকির মুখে পড়েছে। যেভাবে তিস্তা নদীর পানি বাড়ছে এতে করে আবারো বিপদসীমা অতিক্রম করে বন্যার ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ ছাড়াও ধরলা নদীর পানি হুহু করে বাড়ছে। মৌলভীবাজারের সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের বরাক নদীর পানি উপচে পাঁচটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে এসব এলাকার মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। গতকাল রোববার জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বন্যাদুর্গতদের মাঝে তিন মেট্রিকটন খাদ্যসহায়তা দেয়া হয়েছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়্যারম্যান অরবিন্দ পোদ্দার বাচ্চু জানান, কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কুশিয়ারা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এতে কুশিয়ারার পানি স্থানীয় বরাক নদীতে চাপ সৃষ্টি করলে পানি উপচে খলিলপুর ইউনিয়নের চানপুর, আলাপুর, শ্রীচন্দ্রপুর, কাটারাই ও গোড়ারাইÑ এ পাঁচটি গ্রাম পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। যার ফলে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছে। স্থানীয় লোকজন জানায়, তারা পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। অনেকের বাড়িঘরে হাঁটু ও বুকপানিতে নিমজ্জিত। সেই সাথে গরু-বাছুর নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছে। টাঙ্গাইলের নাগরপুরে বন্যা পরিস্থিতি চরম অবনতি হয়েছে। যমুনা ও ধলেশ^রীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় উঁচু বাঁধ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিচ্ছে বানভাসিরা। এমনিতে করোনায় দীর্ঘদিন কর্মহীন উপজেলার দিনমজুর ও নি¤œ আয়ের মানুষ। তার উপর আগাম বন্যায় চরম বিপাকে পড়েছে বানভাসিরা। বন্যাকবলিত এলাকায় শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানিসহ গো-খাদ্যের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। দিনরাত বৃষ্টির কারণে জ্বালানি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বানভাসিদের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। উপজেলার নাগরপুর, সলিমাবাদ, দপ্তিয়র, গয়হাটা, ভারড়া, মোকনা, পাকুটিয়া, ধুবড়িয়া, সহবতপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার বসতঘরে পানি ওঠায় ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে শত শত পরিবার। এ ছাড়া উপজেলার যমুনা ও ধলেশ্বরী নদী সংলগ্ন ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চল তলিয়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকার কাঁচা-পাকা রাস্তা ডুবে গিয়ে আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ইতোমধ্যে বন্যার পানির স্রোতে চৌহালী-আরিচা সড়কের উপজেলার সলিমাবাদ ইউনিয়নের তেবাড়িয়ায় বেইলি ব্রিজ ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যমুনা নদীর পানি গত কয়েক দিন ধরে কমলেও গতকাল রোববার দুপুর থেকে আবারো তা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। অন্য দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল রোববার বিকেল ৬টায় বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৯৯ সেন্টিমিটার এবং ব্রহ্মপুত্রের পানি জামালপুরের পয়েন্টে বিপদসীমার দুই সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় জেলা সদরসহ ৭টি উপজেলার ৫৯টি ইউনিয়নে ও ৮টি পৌরসভায় বন্যা দেখা দিয়েছে। দুই লাখ ৪৬ হাজার ৫০৯ টি পরিবারের ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৫৪১ জন পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। নৌকাডুবিতে দুইজনসহ বন্যার পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত মারা গেছে ৯ জন। বন্যায় ৯ হাজার ১৮৫ হেক্টর জমির ফসল, ২৬০ কিলোমিটার কাঁচা-পাকা সড়ক, চারটি বাঁধ, পাঁচটি ব্রিজ-কালভার্ট, ২৬৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ৬৫৮টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চার হাজার ৪০২টি নলকূপ ও চার হাজার ৮৬৮টি ক্ষতিগ্রস্ত ল্যাট্রিন। বগুড়ার সোনাতলায় যমুনা নদীতে ১৭ সেন্টিমিটার পানি কমলেও বাঙালি নদীতে ৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সাথে পানিবন্দী মানুষগুলো আশ্রয়ণ কেন্দ্র ও বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। সোনাতলা উপজেলার জোড়গাছা, মধুপুর, পাকুল্লা ও তেকানীচুকাইনগর ইউনিয়নের ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এক দিকে মহামারী করোনাভাইরাস অন্যদিকে বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ও মূল্যবান আসবাবপত্র দ্রুত সরিয়ে ফেলছে। এ ছাড়াও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রোববার সরেজমিন উপজেলার তেকানীচুকাইনগর, পাকুল্লা ও জোড়গাছা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার বানভাসি প্রায় দেড় হাজার মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও আশ্রয়ণ কেন্দ্রগুলোতে পরিবার পরিজন নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যা এবং করোনাভাইরাসের কারণে দিনমজুর শ্রেণীর মানুষগুলো কর্মহীন হয়ে পড়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

বাংলাদেশে কোরোনা

সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
সর্বমোট
এক ক্লিকে বিভাগের খবর