শুক্রবার, ২১ জানুয়ারী ২০২২, ০৫:৪৩ পূর্বাহ্ন

যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন পানিবন্দী লাখো পরিবার

ঢাকা অফিস / ১২৩ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২০, ৯:৪৬ অপরাহ্ন

দেশের বিভিন্ন জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। যমুনা, আত্রাই, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি এখনো বিপদসীমার উপরে থাকায় পার্শ¦বর্তী জেলাগুলোর বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। কোথাও কোথাও নতুন নতুন জেলা প্লাবিত হচ্ছে। বাঁধ ভেঙে নাজেহাল অবস্থায় পড়েছে স্থানীয় লোকজন। ভেঙে পড়ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এসব জেলায় লাখো পরিবার পানিবন্দী হয়ে আছে। এ ছাড়া সুনামগঞ্জে তৃতীয় দফায় বন্যার পূর্বাভাসে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন হাওরবাসী। কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামে বন্যার পানি কমলেও বিপদসীমার ওপর নদনদীর পানি খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটে বানভাসী মানুষেরা। ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার সার্বিক বন্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ঘরবাড়ি ও নলকূপ তলিয়ে থাকায় নদ-নদীর অববাহিকার আড়াই শতাধিক চর ও নিম্নাঞ্চলের দুই লক্ষাধিক মানুষ বিশুদ্ধ খাবার পানি ও চরম খাদ্য সঙ্কটে পড়েছে। তীব্র হচ্ছে গবাদিপশু ও শিশু খাদ্যের সঙ্কটও। বন্যার পানির তোড়ে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা এলজিইডির শহর রক্ষা বাঁধের ১০০ মিটার ভেঙে নতুন করে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সামান্য ত্রাণতৎপরতা অব্যাহত থাকলেও তা সবার ভাগ্যে জুটছে না। চোখে পড়ছে না কোনো বেসরকারি এনজিওর ত্রাণতৎপরতাও। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ৫৬টি ইউনিয়ন, ৪৭৫টি গ্রাম, ৩৭ কিলোমিটার রাস্তা এবং ৩২ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা: মো: হাবিবুর রহমান জানান, বন্যাকবলিতদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলায় ৮৫টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। গত ২০ জুন থেকে এ পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১১ জনই শিশু। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মো: রেজাউল করিম জানান, সরকারিভাবে বন্যাদুর্গতদের জন্য ১৬০ মেট্রিক টন চাল ও ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এবং তা বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চিলমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের পানি কমতে শুরু করলেও এখনো বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গ্রামগুলো এখনো বন্যার পানিতে ডুবে রয়েছে। উপজেলা পরিষদ ও চিলমারী মডেল থানাও ডুবে আছে। গত বছরের বন্যার পানির তোড়ে শহর রক্ষা কাঁচকোচ বাজার সড়ক (শহর রক্ষা বাঁধ) ভেঙে গেলেও তা মেরামত না করায় চলতি বন্যায় দ্রুত বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে শহরে। গত দুই দিনে বন্যার পানি বৃদ্ধি পেয়ে উপজেলা পরিষদসহ আশপাশ বেশ কিছু গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে। ফলে হাজার হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় শহরের প্রধান প্রধান সড়ক তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। গত বৃহস্পতিবার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শওকত আলী সরকার বীর বিক্রম ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ ডব্লিউ এম রায়হান শাহ্ নয়ারহাট ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন ও বন্যাদুর্গতদের খবর নেন। ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টিতে গত কয়েক দিনে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে যমুনার পানি। এতে সৃষ্ট বন্যায় টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। উপজেলার গাবসারা, অর্জুনা, গোবিন্দাসী নিকরাই, অলোয়া ও ফলদা ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। বিপদসীমার ১০৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ভাঙন হুমকির মুখে রয়েছে ভূঞাপুর তারাকান্দি সড়ক। চরাঞ্চলসহ উপজেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই পানি প্রবেশ করেছে। অধিকাংশ বাড়িতে পানি ওঠায় বাঁশের মাচা করে আশ্রয় নিয়েছে মানুষ। গত ৩ দিনের অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধিতে ভূঞাপুর-তারাকান্দি সড়কের বিভিন্ন স্থানে লিকেজ দেখা দিয়েছে। এসব লিকেজ মেরামতে কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এ সড়কটি ভেঙে গেলে জেলার প্রায় ৫টি উপজেলাসহ বিভিন্ন অঞ্চল প্লাবিত হবে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে তারাকান্দি যমুনা ফার্টিলাইজার সার কারখানাসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এ ছাড়া তলিয়ে যাবে উপজেলার হাজার হাজার একর ফসলি জমি। টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: সিরাজুল ইসলাম জানান, ভূঞাপুর তারাকান্দি সড়কের গারাবাড়ি ও বলরামপুরে লিকেজ দেখা দেয়ায় জিও ব্যাগ ফেলে বন্ধ করার ব্যবস্থা করছি। এ ছাড়াও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করেছি। মান্দায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত মান্দা (নওগাঁ) সংবাদদাতা জানান, নওগাঁর মান্দায় আত্রাই নদীর ডান তীরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের চার স্থান ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জোতবাজার-আত্রাই সড়কের মধ্যে ৬ কিলোমিটারের মধ্যে ভাঙনকৃত এসব চারস্থান দিয়ে একই এলাকায় প্রবল বেগে প্রবেশ করছে পানি। গত বুধবার বিকেল থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এসব স্থান ভেঙে অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। দুর্গত এলাকার বানভাসী মানুষ আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন বিভিন্ন সড়ক ও উঁচু স্থানে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে খোলা হয়েছে দু’টি আশ্রয়কেন্দ্র। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আত্রাই নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় আটটি বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। ফলে পানির প্রবল চাপ এসে পড়ে মূল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। এতে আত্রাই ও ফকিন্নি (রানী নদী) নদীর অন্তত ৫০টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলো টিকিয়ে রাখতে বাঁধে পাহারা বসিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে দিনরাত কাজ শুরু করেন স্থানীয়রা। এ অবস্থায় বুধবার বিকেলে জোতবাজার-আত্রাই রাস্তার দাসপাড়া নামক স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যায়। এর কিছু পরেই ভেঙে যায় জোকাহাটে মোবাইল ফোন টাওয়ারের কাছে। রাত ৮টার দিকে ভেঙে যায় একই বাঁধের চকরামপুর এলাকা। শেষে রাত ৩টার দিকে পারনুরুল্লাবাদ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে গিয়ে একই এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করে। বন্যার পানিতে মান্দা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অন্য দিকে তলিয়ে গেছে বীজতলাসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত। ভেসে গেছে অসংখ্য পুকুরের মাছ। দুর্ঘটনা এড়াতে বন্যাকবলিত এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ সাময়িক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহা: ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক এমপি জানান, দুযোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালককে মান্দার বন্যা পরিস্থিতির বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। খুব শিগগিরই দুর্গত মানুষদের সার্বিক সহায়তা প্রদান করা হবে। বন্যায় শেরপুর-জামালপুর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ইউএনবি জানায়, বন্যার কারণে শুক্রবার থেকে শেরপুর-জামালপুর সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ ছাড়া উজানের ঢলে বাড়ছে পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের পানি। শেরপুর-জামালপুর মহাসড়কের পোড়ার দোকান ডাইভারশনের বেইলি ব্রিজের দক্ষিণ পাশের মাটি বন্যার পানির তোড়ে ধসে গিয়ে শুক্রবার সকাল থেকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় শেরপুর ফেরিঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ২৬ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। যেকোনো মুহূর্তে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পুরনো ভাঙনের অংশগুলো দিয়ে বন্যার পানি ঢুকে শেরপুরে চরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। ফলে সদর উপজেলার চরপক্ষীমারী, চরমোচারিয়া, কামারেরচর, বেতমারি-ঘুঘুরাকান্দি, লছমনপুর, রৌহা ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া পাহাড়ি ঢলে সদরের গাজীর খামার ও নকলা উপজেলার উরফা ইউনিয়নের ৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে বীজতলা, সবজির আবাদ ও ক্ষেতের ফসল। গাইবান্ধায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি, পানিতে ডুবে কিশোরের মৃত্যু ইউএনবি জানায়, তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গাইবান্ধায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অনবতি হয়েছে। এতে বন্যাকবলিত হয়ে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে চার উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক পরিবার। গাইবান্ধার বানভাসী মোল্লারচর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হাই জানান, ব্রহ্মপুত্র নদীর পানিতে ডুবে আছে চার দিক। সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার ১৬৫টি চরাঞ্চলের অধিকাংশ ঘরবাড়ি এখন পানিতে ভাসছে। কোথাও হাঁটুপানি কোথাও কোমর পানিতে তলিয়ে আছে ঘরবাড়ি। এ দিকে বন্যার পানিতে ডুবে শুক্রবার দুপুরে লিমন নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। সুনামগঞ্জে তৃতীয় দফায় বন্যার পূর্বাভাসে শঙ্কিত হাওরবাসী ইউএনবি জানায়, সুনামগঞ্জে তৃতীয় দফায় বন্যায় হানা দেবে এমন পূর্বাভাসে শঙ্কিত হাওরবাসী। জেলায় প্রথম বন্যা দেখা দেয় ২৫ জুন। দ্বিতীয় দফায় বন্যা হানা দেয় ১০ জুলাই। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, আগামী ২০-২১ জুলাই থেকে আবার জেলার প্রধান নদীগুলোর পানি সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে। বৃষ্টিপাত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বৃদ্ধির এই প্রবণতা ৪-৫ দিন স্থায়ী হতে পারে এবং সে সময়ে জেলার সুরমা, কুশিয়ারা ও যাদুকাটা নদীর পানি সমতল কোথাও কোথাও বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে জেলার নিম্নাঞ্চলে আবারো বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এবং অনেক জায়গায় নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: সবিবুর রহমান বলেন, ‘সোমবার সকাল থেকে সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কমতে শুরু করেছে জেলার সুরমার পানি। তবে হাওরের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। নতুন করে আগামী ২০-২১ জুলাই থেকে আবার জেলার প্রধান নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে এবং এতে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

বাংলাদেশে কোরোনা

সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
সর্বমোট
এক ক্লিকে বিভাগের খবর