মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ১২:৪০ অপরাহ্ন

গুম হওয়া সাংবাদিক কাজলপুত্র পলকের মর্মস্পর্শী চিঠি

নিউজ ডেস্ক | / ৬৮ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২০, ১০:২৭ পূর্বাহ্ন

বহুল আলোচিত যুবলীগ নেত্রী ও লাস্যময়ী নারী শামীমা নূর পাপিয়া-কাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জের ধরে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, পক্ষকাল ম্যাগাজিন সম্পাদক শফিকুল ইসলাম কাজলসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে শেরেবাংলা থানায় মামলা করেন মাগুরা-১ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখর। এরপর আসতে থাকে একের পর এক হুমকি। এর জেরে গুম হন কাজল, মামলার হাজিরা দিচ্ছেন মতিউর রহমান চৌধুরীসহ ৩২ জন।
১০ মার্চ বেলা তিনটার দিকে কাজল হাতিরপুলে তাঁর পত্রিকার কার্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে পুরান ঢাকার বকশি বাজারের বাসা থেকে বের হন। এরপর তাঁর তাঁর দুটি মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে এক ব্যক্তি শফিকুলের ফেসবুকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার আসামি হিসেবে শফিকুলসহ কিছু ব্যক্তির তালিকা পাঠান। বিষয়টি জানতে পেরে পরদিন কাজলের স্ত্রী চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন কাজলকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে আন্দোলনে নামেন। সহপাঠিদের নিয়ে পিতাকে ফেরত পাওয়ার দাবিতে প্রেস ক্লাবের সামনে মানব বন্ধন করেন কাজলের ছেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মনোরম পলক।বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সাংবাদিক কাজলকে সুস্থ অবস্থায় পরিবারের কাছে ফেরত দেয়ার দাবিতে বিবৃতি দিলেও এখন ফিরে আসেননি তিনি।
কাজলের স্ত্রী-সন্তানরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন কিন্তু কাজলকে ফেরত পাচ্ছেন না। কাজলের স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ দীর্ঘদিন ধরে। ভারতে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার কিছু দিনের মধ্যেই স্বামী গুম হলেন। স্বামীর চিন্তায় খাওয়া- দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। দিন দিন অসুস্থতা বাড়ছে। পিতাকে ফিরে পাওয়ার জন্য করোনা উপেক্ষা করে সারাদিন এখান থেকে ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পলক। পলক অনেকটা হতাশ ও ক্লান্ত কিন্তু হাল ছাড়তে নারাজ।
বৃৃৃৃহস্পতিবার ডেইলি স্টার পত্রিকা পিতাকে লিখা পলকের একটি চিঠি ছাপিয়েছে। হৃদয়স্পর্শি এ চিঠি এখানে তুুলে ধরা হলো ।

বাবার উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিতে পলক বলেনঃ

প্রিয় বাবা,

আমি জানি না তুমি কোথায় আছো। ভাল যে নেই তা তীব্রভাবে বুঝতে পারছি। কল্পনা করতে পারছি, কী ভীষণ একা একা সময় পার করছ। বুঝতে পারছি, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছ তুমি। ঠিক সেই সময়ের মতো, যখন তুমি মাকে ভারত থেকে সার্জারির পর ফেরত নিয়ে এসেছিলে। আমার মনে হয় না তারা তোমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারবে। এই চিঠি কি আদৌ তোমার কাছে পৌঁছাবে? তোমাকে কি তারা এই চিঠি পড়তে দেবে? তোমাকে কি তারা ফেরত আসতে দেবে? দিলে কখন দেবে? এই চিঠি যদি তোমার কাছে পৌঁছায়, তবে কিছু কথা তোমাকে বলতে চাই-

তোমার পরিবার এখনও শক্ত আছে। আশায় বুক বেঁধে আছে। এই আশা কখনও ঝাপসা হবে না। আমরা তোমার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় আছি। অধীর আগ্রহের সাথে বসে আছি তোমার জন্য। পৌষি খুবই আশাবাদী। ও এখনও খারাপ কোনো চিন্তা করছে না একটি বারের জন্যও। ওর অনেক কথা বলার আছে তোমাকে। ও এখন মায়ের পাশে ঘুমায়। মা আমাকে জিজ্ঞস করে, ‘তুই আসলেই তোর বাবাকে ফেরত আনতে পারবি? কাজল কবে আসবে? আমাদের কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?’ আমি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কখনও দেই না, কারণ উত্তরগুলো আমার জানা নেই।

আমি তোমাকে ফেরত আনার চেষ্টা করছি। অনেকে বলছেন, আমি ছেলে হিসেবে অনেক করছি। আমি ছেলে হিসেবে পর্যাপ্ত করেছি, এ কথা তখনই ভাবতে পারব যখন তোমাকে আমাদের মাঝে আবার ফেরত পাব। কেউ কেউ বলছেন, আমার মতো ছেলে তাদের যদি থাকত! পিতামাতাকে তাদের সন্তানের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিলে যে কোন সন্তানই তাদের পিতামাতাকে ফেরত পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে। আমিও তাই করছি। আমি আমার বাবা-মা কে চিনি। আমি জানি না আমার বাবা-মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা-মা কিনা। কিন্তু আমি জানি, তোমাদের থেকে শ্রেষ্ঠ বাবা-মা আমার কখনও হতে পারত না। আমি সবসময়ই জানতাম, তোমার আর মার আমার থেকে যোগ্য সন্তান প্রাপ্য ছিল। পিতাকে নিয়ে চলে যাওয়ার ২০ দিন পরেও যে সন্তান তার পিতাকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি, সন্তান হিসেবে তার যোগ্যতা কী? এমন ছেলে থেকে কী লাভ?

আমি জানি, এমন কোনো কিছু আমার সাথে হলে তুমি এতক্ষণে আমাকে ফিরিয়ে আনতে। তুমি আমাকে ফিরিয়ে আনা ছাড়া কখনও ঘরে ঢুকতে না। অনেকের জীবন তুমি এতদিনে কঠিন করে দিতে। আমি তোমার মতো ক্ষমতা রাখি না। আমাদের পরিবার সবসময়ই তোমার ওপরে ভরসা করেছে, বিপদে-আপদে, অসুখে, রোগে, আর্থিক সঙ্কটে । এখন যখন তুমি নেই, আমিই দিশেহারা হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি আমাদের পরিবারের রক্ষণকর্তাকে।

প্রতি রাতে বাসায় সবার পরে আমি ঘুমাতে যাই। যখন রাতে একা জেগে থাকি, সবসময় আশা করি তুমি চলে আসবে। আমি জানি, তারা তোমাকে আহত করেছে, তবু আশা করি, যে কোনো উপায়ে তুমি এখনও নিজের পায়ে ফিরে আসতে পারবে। রাতে বাইরে পায়ের আওয়াজ শুনলে খুবই উদ্বিগ্ন হই। কারও গলার আওয়াজ শুনলে ভাবি, তুমি কি এসেছ?

দেশের পরিস্থিতি আগের কোনো সময়ের মতোই না। রাস্তাঘাট সম্পূর্ণভাবে ফাঁকা। সবাই বাড়িতে থাকছে। আমারও বাড়িতেই থাকতে হচ্ছে। লজ্জাজনক, আমি জানি। তুমি কখনও বাসায় বসে থাকতে না। এখন কেউ আমার সাথে দেখা করতে রাজি হয় না। আমার যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। এমন এক অসহায় অবস্থায় আছি আমি এখন। দেশ অচল হওয়ার আগে আমি ভোরবেলা বের হয়ে যেতাম। রাত ১/২টার আগে ফিরতাম না। আমি একা বের হতে পারি না। আমাকে অনেকেই বলেছে, আমার ওপর নজর রাখা হচ্ছে। কারা রাখছে, কেন রাখছে, আমি তা জানি না। আমি সাবধান থাকছি যেন আমাদেরকে ব্যবহার করে তোমাকে ভয় দেখাতে না পারে।

আমি আশা করি, তুমি তোমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছ বের হয়ে আসার। এই বাজে পরিস্থিতি থেকে আমিও সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি কোনোদিনও থামব না। তোমাকে সুস্থ, জীবিত অবস্থায় ফেরত পাওয়ার আগ পর্যন্ত, আমাকে থামানো যাবে না। আমি আমার বাবাকে যে কোনোভাবে আমাদের মাঝে ফেরত চাই ।

আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। আশা করছি, তুমি দ্রুতই চলে আসবে। আশা করছি, এই চিঠি তোমার কাছে পৌঁছাবার আগেই তুমি চলে আসবে। আশা করছি, এখনি তুমি দরজায় টোকা দেবে, আমি এই শেষ কথা লিখে চিঠি শেষ করার আগে-

ইতি,

তোমার ছেলে
পলক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

বাংলাদেশে কোরোনা

সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
২,৯৪৯
৩৭
২,৮৬২
১৩,৪৮৮
সর্বমোট
১৭৮,৪৪৩
২,২৭৫
৮৬,৪০৬
৯০৪,৫৮৪
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect. Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.