মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৩:৫০ অপরাহ্ন

পোশাক শিল্পে করোনার প্রভাব

Reporter Name / ১০১ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২০, ৭:০৩ পূর্বাহ্ন

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

আমাদের তৈরী পোশাক শিল্প এখন বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের প্রধানতম খাত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার ৭৬ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। কিন্তু পোশাক শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না বলে অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। এই সমস্যার কোনো সম্মানজনক সমাধান এখনো করা সম্ভব হয়নি। এমনিতেই সামান্য মজুরিতে এ শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। আবার ক্ষেত্রবিশেষে তাদের ঠিকমতো বেতন দেয়া হয় না বলে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষও রয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা নিয়েও। মূলত মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও সমন্বয় না থাকার কারণেই দেশের পোশাক শিল্প সেই সনাতনী বৃত্তেই রয়ে গেছে।

তৈরী পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে। সত্তরের দশকের শেষের দিকে রফতানিমুখী খাত হিসেবে এই শিল্পের অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটতে থাকে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানিমুখী শিল্প। ষাটের দশকের শুরুতে ব্যক্তি উদ্যোগে ক্রেতাদের সরবরাহকৃত এবং তাদেরই নির্দেশিত নকশা অনুযায়ী স্থানীয় দর্জিরা পোশাক তৈরি করত। শুধু শিশুদের জামা-কাপড় এবং গেঞ্জি ছাড়া প্রকৃতপক্ষে সে সময়ে তৈরী পোশাক শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল না বললেই চলে। সত্তরের দশকের শেষার্ধ থেকে একটি রফতানিমুখী খাত হিসেবে বাংলাদেশে তৈরী পোশাক শিল্পের উন্নয়ন ঘটতে থাকে। অভ্যন্তরীণ বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং এই খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট সবার আয় বৃদ্ধি পায় ও জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তনও পরিলক্ষিত হয়। খাতটি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং তা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এ অবস্থার বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটেছে। কারণ, সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসের আক্রমণ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিও মোটেই আলাদা নয়। মূলত করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাবেই আমাদের দেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারে ধস নেমেছে। প্রবাসীরা কর্মহীন হয়ে পড়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহে পড়েছে ভাটির টান। এমনকি তৈরী পোশাক শিল্পেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। করোনাভাইরাসের কারণে কার্যত অঘোষিত লকডাউন চলছে সারা দেশে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে গণপরিবহন চলাচলে। সামাজিক দূরত্ব ও জনগণের ঘরে থাকা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা ও সেনাবাহিনী পর্যন্ত মাঠে নামানো হয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সাধারণ ছুটি আগামী ৫ মে পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। যা উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হলেও সব শ্রেণী ও পেশার মধ্যে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের জন্য তা জীবন-মরণ সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।

এমনিতেই লকডাউন ও সাধারণ ছুটির কারণে শ্রমজীবী মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। আর এই অচলাবস্থার মধ্যেই পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে নেমে আসে কাজে যোগদানের খড়গ। দেশে যখন করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য মানুষ চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী জীবন যাপন করছেন, ঠিক তখনই মালিকরা কারখানা খোলার ঘোষণা দিয়ে দায়িত্বহীনতা ও অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন বলে সব মহলেই সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন। মালিকপক্ষের এই ঘোষণা পেয়েই জীবন-জীবিকার তাগিদে ও চাকরি বাঁচানোর জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখ লাখ শ্রমিক দলে দলে ঢাকায় ফিরে আসেন। সাভার, গাজীপুর, মাওয়াসহ ঢাকার প্রবেশদ্বারগুলোতে কর্মস্থলের উদ্দেশে হাঁটতে দেখা গেছে হাজার হাজার শ্রমিককে। ফেরিঘাটগুলোতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়।
কিন্তু সারা দেশ যেখানে কার্যত অবরুদ্ধ সেখানে হঠাৎ করে এমন অমানবিক ও ভয়ঙ্কর পথে লাখ লাখ গার্মেন্ট শ্রমিককে কেন ঢাকায় ছুটে আসতে হলোÑ সে প্রশ্নের সঠিক ও গ্রহণযোগ্য জবাব সংশ্লিষ্টরা দিতে পারছেন না। কারখানা মালিকদের এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত দেশের আত্মসচেতন মানুষকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। যদিও তীব্র সমালোচনার মুখে অনেকটা মধ্য রাতে ফের কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন গার্মেন্ট মালিকরা। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।

মূলত গার্মেন্ট মালিকদের উচ্চাভিলাষের কারণেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, বিশ্বজুড়ে করোনা-সংক্রমণ রোধে পার্সোনাল প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্টÑ পিপিইর ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। অত্যন্ত চড়া দামে ব্যাপকহারে এই পিপিই রফতানি করতে গার্মেন্ট খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালিকপক্ষ বলে মনে করছে অভিজ্ঞ মহল। তবে এর চেয়েও বড় কারণ মনে করা হচ্ছে গার্মেন্ট শিল্পের জন্য সরকার ঘোষিত পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ভাগবাটোয়ারা। প্রণোদনা পেতেই গার্মেন্ট মালিকরা কারখানা খোলার এমন ভয়াবহ ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মূলত বিকেএমই ও বিজিএমইএর দায়িত্বহীন, অদূরদর্শিতা ও লোভের কারণে ঢাকার দেড় কোটি মানুষ করোনার হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছে। তারা গার্মেন্ট শ্রমিকদের কারখানা খোলা নিয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না দেয়ায় এক রাতে ৩৪ লাখ মানুষ ঢাকায় ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং তারা আবার ফেরতও গেছেন। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় করোনা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। আর এর দায় কারখানা মালিকরা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।

এ দিকে করোনা সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে সরকারি ছুটির মধ্যেই তৈরী পোশাক শিল্প মালিকরা যেভাবে শ্রমিকদের অমানবিকভাবে তাদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার অধিকার লঙ্ঘন করে চাপের মুখে কর্মস্থলে ফিরতে বাধ্য করেছেন তার তীব্র সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সম্প্রতি সংস্থাটি বলছে, মালিকপক্ষের জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী এই অবিবেচনাপ্রসূত স্বার্থপর আচরণে লাখ লাখ শ্রমিক এবং কার্যত গোটা দেশই করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে। মালিকদের হুমকিতে ‘চাকরি বাঁচাতে’ দূর-দূরান্ত থেকে লাখ লাখ শ্রমিক যেভাবে হেঁটে কাজে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছেন, তাকে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার অধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে টিআইবি।

মূলত করোনাকেন্দ্রিক পরিস্থিতিকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী সর্বপ্রথম দেশের সব বড় রফতানি খাত পোশাক শিল্পের পাশে দাঁড়িয়েছেন, যা বর্তমান সরকারের একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। রফতানি খাতের শ্রমিকদের বেতনভাতা অব্যাহত রাখার জন্য নামমাত্র সার্ভিস চার্জে ঋণ প্রদানের লক্ষ্যে যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তার প্রায় ৮৫ শতাংশ এ খাতের। তারপরও এ খাতের নেতারা শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার অধিকার লঙ্ঘন করে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যঝুঁঁকির মধ্যে ফেলে দিয়ে জাতীয় স্বার্থবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন, যা শুধু নিন্দনীয়ই নয়, বরং দেশ ও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক পোশাক শিল্প মালিককে উদ্ধৃত করে খবর বেরিয়েছে যে, সরকারের ঘোষিত তহবিল, অনুদান না হয়ে সহজ শর্তে ঋণ হওয়ায়, মালিকপক্ষ পরিকল্পিতভাবেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। শ্রমিকদের জানমালের নিরাপত্তা তথা পুরো দেশকে এভাবে জিম্মি করে দরকষাকষির হাতিয়ার বানানোর এই পদক্ষেপ সব মহলেই তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের ও অন্যান্য মন্ত্রী এবং জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই পোশাক শিল্প মালিক হওয়ার পরও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, সরকারের ভেতরে নানা স্বার্থান্বেষী মহল এই জাতীয় দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে প্রকারান্তরে সরকারকেই জিম্মি করে অতিরিক্ত সুবিধা আদায়ে সক্রিয় রয়েছে।

সার্বিক দিক বিবেচনায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিকদের শ্রমের কল্যাণেই পোশাক শিল্প এখন দেশের প্রধান রফতানি খাত। শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের কাঁধে ভর করেই মালিকরা অঢেল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। অথচ এসব পোশাক কারখানার শ্রমিকরাই প্রতিনিয়ত নানাভাবে অধিকারবঞ্চিত হচ্ছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে শুধু মালিকপক্ষের স্বার্থের কথাই ভাবা হয়। শ্রমিকদের মানবিক দিকও বিবেচনায় আনা হয় না। এমতাবস্থায় এই শিল্পকে আরো গতিশীল ও সময়োপযোগী করতে হলেও সবার আগে শ্রমিকদের সমস্যার সমাধান করতে হবে। মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি করতে হবে নিবিড় সেতুবন্ধ। কারখানাগুলোকে করতে হবে পুরোপুরি শ্রমিকবান্ধব। তাহলেই এই শিল্পকে আমরা আরো এগিয়ে নিতে পারব।
smmjoy@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর ....

বাংলাদেশে কোরোনা

সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
২,৯৪৯
৩৭
২,৮৬২
১৩,৪৮৮
সর্বমোট
১৭৮,৪৪৩
২,২৭৫
৮৬,৪০৬
৯০৪,৫৮৪
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect. Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.